ভারী বৃষ্টিতেও থেমে নেই নবান্ন অভিযান, ‘বন্দি বেশে’ ন্যায় ও কর্মসংস্থানের দাবি!

আজ সকাল থেকেই কলকাতার রাজপথ জনস্রোতে ভরে উঠেছে, যার গন্তব্য একটাই – নবান্ন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত আকাশ-বাতাস: “আমরা কাজ চাই, ন্যায় চাই!”, “চাকরি চাই, ভিক্ষে নয়!” দুর্নীতি আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে একজোটে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। এই নবান্ন অভিযানে সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল চাকরিহারাদের অভিনব প্রতিবাদ, যা সবার নজর কেড়েছে।

অভিনব প্রতিবাদ: ‘বন্দি পোশাক’ ও ‘বেড়ি’তে প্রতীকী যন্ত্রণা
মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন চাকরিহারাদের এক দল, যারা নিজেদের বঞ্চনা ও যন্ত্রণা বোঝাতে এক ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছেন। কেউ ‘বন্দি পোশাকে’, কেউ হাতে-পায়ে বেড়ি পরে, আবার কেউ কালো কাপড়ে চোখ ঢেকে হাঁটছিলেন। এই দৃশ্য যেন দীর্ঘদিনের বঞ্চিত ও অপমানিত চাকরিপ্রার্থীদের মৌন এবং প্রতীকী প্রতিচ্ছবি। তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, ন্যায্য দাবির জন্য দাঁড়িয়ে আজ তারা সমাজের চোখে কার্যত ‘দোষী’, এবং কথা বলাও যেন তাদের জন্য অপরাধ হয়ে উঠেছে। তাদের এই ‘জেলের পোশাকে’ প্রতিবাদ এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে আন্দোলনে।

প্রশাসনের কঠোর প্রস্তুতি ও আন্দোলনকারীদের দৃঢ়তা
অন্যদিকে, নবান্ন অভিযান ঠেকাতে প্রশাসনের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্যারিকেড, জলকামান, বিশাল পুলিশবাহিনী – সবই মজুত করে রাখা হয়েছিল, যাতে কোনোভাবেই মিছিলের ঢেউ নবান্নের প্রাচীর স্পর্শ করতে না পারে। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড তৈরি করে মিছিলের গতি শ্লথ করা হয়েছে এবং রাস্তায় রাস্তায় দাঙ্গা দমন বাহিনীও মোতায়েন আছে।

প্রশাসনের যুক্তি, আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও, আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তারা বাধা দিতেই পারে। তবে প্রতিবাদীরা দৃঢ় কণ্ঠে বলছেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। জলকামান আর লাঠি দিয়ে আমাদের ন্যায্য দাবি দমিয়ে রাখা যাবে না।”

আন্দোলনের মূলে দুর্নীতি: যোগ্যদের বঞ্চনা
এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC), প্রাথমিক টেট এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির দুর্নীতির অভিযোগ। বহু চাকরিপ্রার্থী অভিযোগ করছেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা বঞ্চিত হয়েছেন, এবং মোটা টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। কেউ আদালতের রায়ে চাকরি হারিয়েছেন, আবার কেউ একাধিকবার পরীক্ষায় পাস করেও এখনো নিয়োগপত্র পাননি।

আন্দোলনকারীদের দাবি, “আমরা কোনো দয়া চাই না। আমরা শুধু আমাদের প্রাপ্যটা চাই। আমরা পাস করেছি, যাচাই প্রক্রিয়া হয়েছে, তবু চাকরি পাচ্ছি না। কাদের কারণে? সেই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কারণে।”

প্রতিবাদের বার্তা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
এই অভিনব প্রতিবাদ যেমন নজর কাড়ছে, তেমনই এটি সরকার ও সমাজের কাছে এক কড়া বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। শুধু প্ল্যাকার্ড নয়, তাদের মুখ, শরীর, পোশাক – সব কিছু দিয়ে তারা বলছেন, “আমরা বঞ্চিত, আমরা বেপরোয়া নই, কিন্তু আমাদের যন্ত্রণা বাস্তব।” এই আন্দোলনে বিভিন্ন বয়সের এবং বিভিন্ন জেলার চাকরিপ্রার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে, যারা একই ব্যথায় এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন।

নবান্ন অভিযান আজকের মধ্য দিয়ে এক নতুন মোড় নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে – প্রশাসন কি এবার আলোচনায় বসবে? নাকি এই আন্দোলন আরও বড় পরিসরে রূপ নেবে? বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে রাজ্য প্রশাসনের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ – একদিকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর ন্যায্য দাবি শোনা ও বিচার করা।

এখন দেখার, এই প্রতিবাদের আওয়াজ নবান্নের কাঁচঘরে পৌঁছোয় কিনা – নাকি জলকামানেই তা ধুয়ে মুছে ফেলা হয়। চাকরিহারাদের পক্ষে, এটা শুধু একটি মিছিল নয় – এটাই তাদের অস্তিত্বের লড়াই।