“বান্ধবীদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসত…?”-IIM জোকায় ধর্ষণ কাণ্ডেও মনোজিত্‍-মডেল?

কলকাতার জোকা আইআইএম-এ তরুণী মনোবিদকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় এবার নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য সরকার। এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে গঠন করা হয়েছে ৯ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট), যার নেতৃত্বে রয়েছেন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। ঘটনাটি ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে, যার জট খুলতে সিট মরিয়া হয়ে উঠেছে।

তদন্তকারী দলটি নির্যাতিতার সঙ্গে কথা বলবে এবং প্রয়োজনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে। তাদের সামনে এখন অনেকগুলো প্রশ্ন: শুক্রবার রাতে ওই তরুণী হস্টেলে ঢুকলেন কীভাবে? রেজিস্টারে সই করানো হয়নি কেন, এবং কার নির্দেশে? অভিযুক্ত দ্বিতীয় বর্ষের ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া পরমানন্দ তোঁয়াওয়ার কতটা প্রভাবশালী? সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সূত্র মারফত খবর।

অভিযুক্তের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল ও ‘মানসিক সমস্যা’র বিতর্ক
তদন্তকারী অফিসারদের নজরে এখন অভিযুক্ত পরমানন্দ তোঁয়াওয়ারের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল। পুলিশ জানতে পেরেছে, অভিযুক্ত পরমানন্দর কোনো মানসিক সমস্যা ছিল না। তাহলে কেন তরুণী মনোবিদকে কাউন্সেলিংয়ের কথা বলে ক্যাম্পাসে ডেকেছিলেন? অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের হরিদেবপুর থানায় ডেকে মানসিক সমস্যার কোনো পুরনো রেকর্ড আছে কিনা, তা জানতে চেয়েছেন তদন্তকারী অফিসাররা।

ইতিমধ্যে হস্টেলের সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছে পুলিশ। ওই তরুণী ক্যাম্পাসে কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রাস্তার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে তরুণী আইআইএম-এর হস্টেলে ঢুকেছিলেন। হস্টেলের যে ঘরে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, সেই রুম সিল করা হয়েছে এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। অভিযুক্তের পোশাকও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং ধৃত ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়ার মেডিকো লিগ্যাল টেস্ট করানো হবে বলে সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে।

ক্যাম্পাসে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট: কেন ডাকা হয়েছিল তরুণীকে?
নির্যাতিতা তরুণীর অভিযোগ অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয় হওয়ার পর কাউন্সেলিংয়ের জন্যই অভিযুক্ত তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর দুপুরে দেওয়া পিৎজা ও জল খেয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং তখনই তাঁকে যৌন নির্যাতন করা হয়। আইআইএম জোকা ক্যাম্পাসে ওই তরুণী মনোবিদ প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

আইআইএম কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছে যে, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারিণী একসঙ্গে বাইরে থেকে একটি ক্যাব ধরে ক্যাম্পাসে আসেন। ক্যাম্পাসের নিয়ম মেনে সিকিউরিটি অফিসারকে আগাম মেল করে অভিযুক্ত জানিয়েছিল যে, তার এক বন্ধু দুপুরে ক্যাম্পাসে আসছেন। বিকেল ৩টা ১০ মিনিট নাগাদ তরুণী ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে একটি ক্যাব বুক করে বেরিয়ে যান।

অভিযুক্তের ‘কীর্তি’ ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত
জোকা আইআইএম-এর এই ঘটনার পর অভিযুক্ত পরমানন্দ মহাবীর টোপ্পান্নাবার ওরফে পরমানন্দ জৈনের একের পর এক ‘কীর্তি’ পুলিশের কাছে সামনে এসেছে। পুলিশ আধিকারিকরা খবর পেয়েছেন যে, এই কলেজ ক্যাম্পাসে মহিলা তথা বান্ধবীদের ডেকে নিয়ে আসা পরমানন্দর কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগেও একাধিক মহিলা তার হাত ধরে কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকেছিলেন বলে পুলিশের কাছে খবর রয়েছে।

পুলিশ জেনেছে, এমবিএ-র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র পরমানন্দ কলেজের একটি কমিটিতেও ছিল। সেই সূত্র ধরেই সে কলেজে ‘দাদাগিরি’ ফলানোর চেষ্টা করত এবং নিরাপত্তারক্ষীদের প্রভাবিত করে রাখত। কোনো নিরাপত্তারক্ষী তার কথা না শুনলে তাকে পরমানন্দের হুমকির মুখে পড়তে হত। তাই কোনো বহিরাগত সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে কলেজে নিয়ে এলেও পরমানন্দের নির্দেশে কলেজের গেটের রেজিস্টার খাতায় সেই অতিথির কোনো নাম লেখা হত না।

বিভিন্ন ‘কীর্তির’ কারণে পরমানন্দর বিরুদ্ধে আইআইএম জোকা কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছিল, সেই কারণেই সে কলেজের ভোটে দাঁড়াতে পারেনি। তবে তাতে এই মেধাবী ম্যানেজমেন্ট ছাত্রের রোয়াব কমেনি। মহিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য পরমানন্দ নিজের ভুয়ো ‘জৈন’ পদবি ব্যবহার করত। সে অত্যন্ত মেধাবী এবং চারটি ভাষায় দক্ষ। ম্যানেজমেন্ট প্রবেশিকা পরীক্ষায় সে ৯৯.৭৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল এবং ২০২২ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংও পাশ করে।

পিতা-পুত্রের বয়ান বিতর্ক: সত্যের সন্ধানে সিট
বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে পরমানন্দ। কেনই বা অভিযুক্ত দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রের মনোবিদের দরকার হল, তা নিয়ে পুলিশ সন্দিহান। আবার অভিযোগকারিণী সত্যিই পেশাদার মনোবিদ কিনা, তিনি কোথা থেকে কোর্স করেছেন, তাও পুলিশ জানার চেষ্টা করছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে অভিযোগকারিণীর বাবার বয়ান নিয়ে। তিনি দাবি করেছেন যে, ‘স্টাডি মেটেরিয়াল’-এর জন্য তাঁর মেয়ে আইআইএম জোকায় গিয়েছিলেন এবং তাঁর মেয়েই তাঁকে জানিয়েছেন যে ধর্ষণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। অভিযোগকারিণীর বাবার বক্তব্য, তাঁর মেয়ের উপর কোনো অত্যাচার হয়নি অথবা কেউ মেয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেনি।

এখন বিশেষ তদন্তকারী দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— ধর্ষণের অভিযোগ সত্যি, নাকি বাবার বয়ান? এই দুই বিপরীতমুখী তথ্যের মধ্যে থেকে আসল সত্য উদ্ঘাটন করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।