মালদায় ঐতিহ্যবাহী আমবাগান নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে, লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নাকি জমি মাফিয়ার থাবা?

আমের জেলা মালদা। বিশ্বজুড়ে যার পরিচিতি, সেই আম শুধু এই জেলার অর্থনীতির ইঞ্জিনই নয়, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। অথচ, সেই ঐতিহ্যবাহী আমবাগানগুলিই এখন নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী এবং পরিবেশপ্রেমীদের মধ্যে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত আম গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠছে, এবং এর পেছনের কারণ হিসেবে উঠে আসছে জটিল এক চিত্র – যেখানে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক, জমির মাফিয়াতন্ত্র এবং প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার এক হতাশাজনক সমীকরণ কাজ করছে।

আম গাছ নিধনের কারণ ও পরিণাম:

জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই আম বাগানের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এমনকি দু’দিন আগে হরিশ্চন্দ্রপুরে ফলন্ত গাছ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে, যা সকলকে শঙ্কিত করছে। এভাবে আম গাছ কেটে ফেলা হলে একদিকে যেমন জেলায় আম চাষের পরিধি কমবে, তেমনই মালদার মূল অর্থনীতিতে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

কিন্তু কেন বাগান মালিকরা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন? প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে জমির মাফিয়াতন্ত্র। দেখা যাচ্ছে, রাজ্য বা জাতীয় সড়কের ধারে থাকা কিংবা শহর লাগোয়া এলাকা, যেখানে আধুনিক আবাসন গড়া সম্ভব, সেসব জায়গাতেই আম গাছ বেশি কাটা হচ্ছে। জমির দাম হু হু করে বাড়ছে, তাই অনেকেই মোটা টাকায় বাগান বিক্রি করে দিচ্ছেন। ক্রেতারা সেই জমি অন্য কাজে লাগাচ্ছেন, যেখানে তাদের লাভ বেশি এবং ঝুঁকি কম।

হরিশ্চন্দ্রপুরের আম বাগানের মালিক সন্তোষ মণ্ডল জানান, “এখন আম চাষ করা খুব ঝুঁকির। বাগান পরিচর্যার খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছে, কিন্তু আমের সঠিক দাম পাওয়া যাচ্ছে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “এক কিলো আমের উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ টাকা, অথচ এবছর আট টাকা দরে বিক্রি করেছি। এভাবে ক্ষতি স্বীকার করে ক’জন বছরের পর বছর আম চাষ করতে পারবে?” তার আক্ষেপ, একসময় সারা দেশে মালদার আম যেত, এখন অসম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্য ছাড়া বাকি কোথাও এখানকার আম যায় না।

পুরাতন মালদার আমচাষি ও বাগান মালিক নকুল সরকারের বক্তব্যও একই রকম। তিনি বলেন, “শুধু বাগান পরিচর্যার ঝক্কিই নয়, এখন বাগানে কাজ করার শ্রমিকেরও প্রচণ্ড অভাব। বেশিরভাগ শ্রমিক এখন ভিনরাজ্যে কাজ করতে পছন্দ করে, কারণ সেখানে তাঁদের উপার্জন বেশি।” তিনি হতাশ হয়ে জানান, তাঁর ছেলে সরকারি চাকরি করে এবং আম বাগান করতে চায় না। এই পরিস্থিতিতে বয়সের ভারে ন্যুব্জ নকুলবাবুও অল্প অল্প করে বাগান বিক্রি করতে শুরু করেছেন।

মালদার আমের ইতিহাস ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ:

মালদা জেলায় প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। একসময় প্রায় সাড়ে তিনশো প্রজাতির আম মালদায় উৎপন্ন হলেও, এখন শ’খানেক প্রজাতিই নজরে আসে। পাঁচ দশক আগে ২৪৩ প্রজাতির আম নথিভুক্ত ছিল। একটা সময় ছিল যখন কোন বাগানে কত প্রজাতির আম গাছ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হতো এবং যার বাগানে যত বেশি প্রজাতির গাছ থাকত, তার সম্মানও তত বাড়ত। এখন সেই ‘সোনালি অতীত’ নেই। অধিকাংশ বাগান মালিক এখন নিজে আম চাষ করেন না, বরং তাঁদের বাগান এক বা কয়েক বছরের জন্য ব্যবসায়ীদের লিজ দিয়ে দেন।

ব্যবসায়ীরা কেবল ফলনের দিকে নজর রাখেন এবং ফলন যাতে না কমে তার জন্য প্রতিটি গাছে যথেচ্ছ হারে হরমোন প্রয়োগ করেন। এতে হয়তো ফলন হচ্ছে, কিন্তু গাছের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে। উপরন্তু, জেলার আমবাগানগুলির অধিকাংশই অনেক পুরনো এবং গাছের বয়স হয়েছে, যার ফলে প্রাকৃতিক নিয়মে উৎপাদন কমেছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে প্রতি বছর উৎপাদনের পর আম গাছ ছাঁটাই করে ছোট রাখতে হবে, যাতে ফলন বেশি হয় এবং আমের আকারও বড় হয়।

প্রশাসন ও বণিকমহলের ভূমিকা:

মালদা ম্যাঙ্গো মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক উজ্জ্বল সাহা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, “জেলায় আম চাষের পরিধি বাড়াতে আমরা সরকারের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু কিছু জমি মাফিয়ার জন্য আমাদের সেই চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে। এই মাফিয়াদের সঙ্গে বন দফতরের আধিকারিক ও কর্মীদের একাংশের সরাসরি যোগ রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি গাছ কাটলে পাঁচটি নতুন গাছ লাগাতে হবে এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ দেখার দায়িত্ব বন দফতরের। উজ্জ্বল সাহা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আমকে মালদার লক্ষ্মী হিসাবে উল্লেখ করেছেন এবং বিনা পয়সায় আম গাছের চারা বিলি করা হচ্ছে।” কিন্তু তারপরও জমি মাফিয়া আর বন দফতরের একাংশের মদতে আম গাছের নিধনযজ্ঞ চলছে, যা উদ্বেগজনক।

উজ্জ্বল সাহা আরও বলেন, “জমি মাফিয়ারা অল্প কিছু বাগান মালিককে প্রভাবিত করতে পারলেও আজও মালদা জেলার সেন্টিমেন্ট আম। এখনও অনেক মানুষ সারাদিনে অন্তত একবার আম বাগানে যান। পরবর্তী প্রজন্মের অনেকে আম চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে না সেটা ঠিক। আবার উলটোটাও হয়েছে। অনেক উচ্চশিক্ষিত যুবক আধুনিক পদ্ধতিতে নিজেদের পৈতৃক বাগান পরিচর্যা করছেন। দেশ-বিদেশের নানা প্রজাতির আম গাছের চারা সংগ্রহ করে তাঁরা বাগানে লাগাচ্ছেন। তাঁদের অনেকের বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে এবার আমরা বিদেশে রফতানি করেছি।”

তিনি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে মালদাকে ‘ম্যাঙ্গো হাব’ হিসাবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ম্যাঙ্গো হাব হিসাবে ঘোষণা হলেই এই জেলায় আমের উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে। চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চাষি ও বাগান মালিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাবেন। বিদেশে রফতানির পরিমাণ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে। এককথায়, এই জেলায় আমের অর্থনীতিটাই আমূল বদলে যাবে।”

জেলা উদ্যান পালন ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর সামন্ত লায়েক জানান, “একটা সময় জেলার আমচাষিরা বাগান প্রতিপালনে উৎসাহ হারাচ্ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করেছি। চাষের নতুন পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে বিস্তর কথা হয়েছে। এখন অনেক চাষিই তাঁদের বাগানে থাকা পুরোনো গাছ সরিয়ে নতুন চারা লাগাচ্ছেন। এবছর থেকে জেলায় ব্যাগিং সিস্টেমে আম চাষ করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত আমের চাহিদা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বেড়েছে। রফতানির তালিকায় প্রতি বছর নতুন নতুন দেশ যোগ হচ্ছে। আগামী বছর আমাদের লক্ষ্য, শুধু বিদেশে নয়, দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে জেলার আম পৌঁছে দেওয়া।” তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে জেলার তিনটি প্রজাতির আম জিআই ট্যাগ পেয়েছে। আরও কয়েকটি প্রজাতির আম সেই তকমা পাওয়ার তালিকায় রয়েছে। আর যদি একবার মালদা জেলাকে ম্যাঙ্গো হাব হিসাবে ঘোষণা করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আমই এই জেলাকে একটা অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।”

আম গাছ কাটা নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে সামন্ত লায়েক বলেন, “দু’দিন আগেই আমাদের দফতরের সচিব জেলায় এসেছিলেন। আম গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তিনি জেলাশাসকের উপস্থিতিতে প্রশাসনিক বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেন। এনিয়ে বন দফতরের কর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন। আসলে গাছ কাটার বিষয়টি দেখা আমাদের এক্তিয়ারে নেই। সেই দায়িত্ব বন দফতরের। সরকারি নিয়মে একটি গাছ কাটলে পাঁচটি নতুন গাছ লাগাতে হয়। সেটা দেখার দায়িত্বও বন দফতরের।”

যদিও জেলা বনাধিকারিক জিজু জেকব এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে অস্বীকার করে শুধু বলেন, “জেলার আম বাগানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে আমরা সতর্ক রয়েছি।” মালদার সুপ্রাচীন এই ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসন ও বন দফতর কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।