লিগ্যাল সেলে কেন মনোজিৎ? অভিযুক্তের সঙ্গে TMCP নেতা প্রান্তিক ও রাজন্যার ‘ঘনিষ্ঠতা’ নিয়ে প্রশ্ন?

সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের গণধর্ষণ কাণ্ডে ধৃত মনোজিৎ মিশ্রের সঙ্গে সাসপেন্ডেড তৃণমূল ছাত্র পরিষদ (TMCP) নেতা প্রান্তিক চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী রাজন্যা হালদারের ‘ঘনিষ্ঠতা’ নিয়ে নতুন করে অভিযোগ সামনে আসায় বিতর্ক আরও দানা বেঁধেছে। এই অভিযোগের তির এবার খোদ কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং আইনজীবী তিতাস মান্নার দিকে।
মনোজিতের কুকীর্তি সামনে আসার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন রাজন্যা। তিনি দাবি করেছিলেন, আরও অনেক মনোজিৎ তৃণমূলে রয়েছে, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তাঁর নগ্ন ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এবার প্রান্তিক এবং রাজন্যার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এনেছেন ওই ল কলেজেরই প্রাক্তন ছাত্র, আইনজীবী তিতাস মান্না। তাঁর দাবি, “২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের লিগ্যাল সেল তৈরি হয়েছিল। তার দায়িত্বে ছিলেন রাজন্যার স্বামী প্রান্তিক চক্রবর্তী। আর ওই সেলের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে মনোজিৎ মিশ্রের নাম সুপারিশ করেছিলেন প্রান্তিকই।” শুধু তা-ই নয়, তিতাসের আরও অভিযোগ, ছাত্রী নির্যাতন থেকে শুরু করে পুলিশের কাছে অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মনোজিৎকে কেন লিগ্যাল সেলে নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। সে কারণে প্রান্তিক তাকে ‘শো-কজ়’ করেন বলেও তিতাস দাবি করেছেন। ছবি, শো-কজ়ের চিঠি এবং হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ দেখিয়ে তিতাস আরও বলেছেন, “কী কারণে শো-কজ় করা হলো, অপরাধ কী ছিল জানতে চাইলে উত্তর দেননি রাজন্যার স্বামী।”
তিতাসও একসময় ক্যাম্পাসে TMCP-ই করতেন। ফলে তাঁর অভিযোগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন TMCP-এর অন্যরাও। এ ছাড়া প্রান্তিক ও রাজন্যার সঙ্গে এক ফ্রেমে মনোজিতের একটি ছবি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, এই ছবিটি সাউথ সিটি মলের কাছে প্রান্তিকের একটি ক্যাফেতে কয়েক বছর আগে তোলা। মনোজিৎ সেখানে গিয়েছিলেন প্রান্তিককে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে। যদিও ‘এই সময়’ এই ছবির সত্যতা যাচাই করেনি, তবে প্রান্তিক-রাজন্যাও ছবিটি ‘ফেক’ বলে দাবি করেননি।
তিতাসের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রান্তিক চক্রবর্তী বলছেন, “এ কথা ঠিক আমি একসময়ে টিএমসিপি-এর চিফ কো-অর্ডিনেটর ছিলাম। তখন আমার কমিটিতে মনোজিতের কোনো ঠাঁই ছিল না। এ কথাও ঠিক মনোজিতকে ২০২২-এ কমিটিতে আনা হয়েছিল। কিন্তু তাতে আমার কোনো সুপারিশ ছিল না। কারণ ওই কমিটির চিফ কো-অর্ডিনেটর আমি ছিলাম না। আর আমার কমিটিতে মনোজিৎ ছিল না।” ছবি-বিতর্ক প্রসঙ্গে প্রান্তিক বলছেন, “আমি একবারও তো বলিনি মনোজিৎকে আমি চিনতাম না। একটা সময়ে সারা রাজ্য থেকে আমার জন্মদিনে ছেলেমেয়েরা আসত ফুল-কেক নিয়ে। মনোজিৎও এসেছিল। ওর ছবি তো আরও অনেকের সঙ্গে রয়েছে। তাতে কী প্রমাণিত হয়? ওকে ধর্ষণ করার লাইসেন্স তাঁরা দিয়েছেন না আমি?”
রাজন্যাও মনোজিতের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাননি। তিনি বলেন, “আমি তো একবারও অন্যদের মতো বলছি না যে মনোজিৎ তৃণমূলের কেউ ছিল না। অবশ্যই ছিল। সেই কারণেই তো আমার এই প্রতিবাদ।” এরই মধ্যে অবশ্য রাজন্যা ও প্রান্তিকের বিজেপি যোগ নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তাঁরা দুজনেই অবশ্য সেই সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন।
এদিকে, কসবা ল কলেজের তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ আজই হাইকোর্টে রিপোর্ট দিয়েছে। আদালত তদন্তের কেস ডায়েরি খুঁটিয়ে দেখেছে এবং অগ্রগতি রিপোর্ট নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবীকেও দিয়েছে। তবে তা কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না বলে নির্দেশ হাইকোর্টের।
এই ঘটনা রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংগঠনগুলির ভূমিকা, তাদের স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং পাল্টা অভিযোগের এই খেলায় শেষ পর্যন্ত সুবিচার কতটা নিশ্চিত হয়, সেটাই এখন দেখার।