বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বে নয়া মোড়, শমীক ভট্টাচার্যের হাতে ব্যাটন, লক্ষ্য ২৬-এর ‘তৃণমূলমুক্ত বাংলা’

অপেক্ষার অবসান! জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। কলকাতার সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে দলীয় পতাকা তুলে দেন সদ্য প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সুনীল বনসল, রবিশঙ্কর প্রসাদ, মঙ্গল পান্ডে, অমিত মালব্য সহ রাজ্য ও কেন্দ্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তবে, এই গুরুত্বপূর্ণ দিনে বঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে চাপা গুঞ্জন সৃষ্টি করেছে।
আক্রমণাত্মক মেজাজে শমীক: “তৃণমূলের পরপার নিশ্চিত!”
দায়িত্ব গ্রহণের পরই শমীক ভট্টাচার্যকে দেখা গেল এক আক্রমণাত্মক মেজাজে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ নীতিকে সামনে রেখে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ। শমীক বলেন, “একসময় বাংলায় বিজেপি ছিল ব্রাত্য, সর্বদলীয় বৈঠকেও আমাদের ডাকা হতো না। বিজেপির ভোট ছিল এক শতাংশের নিচে। আর আজ বাংলার মানুষ তৃণমূলকে হটিয়ে বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনের জন্য তৈরি হচ্ছে। তাই এবারে আর ২০০ পার নয়, তৃণমূলের পরপার নিশ্চিত।” তাঁর কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সততার প্রতীক’ এখন আর কাজে লাগছে না, এবং বাংলার মানুষ স্থির করে ফেলেছেন যে ২৬-এর ভোটে দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল সরকারকে তারা বিদায় জানাবেন।
সংখ্যালঘু ভোট টানার কৌশল: “আমরা সংখ্যালঘু বিরোধী নই”
বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচলিত ‘সংখ্যালঘু বিরোধী’ তকমা ঘোঁচানোর জন্য শমীক ভট্টাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সক্রিয় হয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “আমরা সংখ্যালঘু বিরোধী নই, কারণ বাংলায় সংখ্যালঘুরাও আক্রান্ত।” তিনি দুর্গাপূজার বিসর্জন এবং মহরমের শোভাযাত্রা একই সাথে হোক বলে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন, যা রাজ্যের ধর্মীয় সম্প্রীতির উপর জোর দেয়। সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে শমীকবাবু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “মুসলমান মানেই কি সমাজবিরোধী? যারা আমাদের অচ্ছুত মনে করেন তাদের বলব, আমাদের ভোট দিতে না চাইলে দেবেন না, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ান। দেখতে পাবেন বাংলায় সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছেন মুসলমানরাই। কাদের জন্য এটা হল? তাদের বিদায় জানাবেন না?” এই বার্তা দিয়ে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে বিজেপির অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
বাম-কংগ্রেসকে বার্তা: “ভোট কাটতে গিয়ে তৃণমূলকে ফেরাবেন না”
বাম, কংগ্রেস, এসইউসিআই সহ রাজ্যের অন্যান্য বিরোধী দলগুলির উদ্দেশ্যেও কড়া বার্তা দিয়েছেন বঙ্গ বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি। শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, “নো ভোট টু বিজেপি”-র আড়ালে একটি চক্রান্ত তৈরি হচ্ছে। তিনি অনুরোধ করেন, “ভোট কাটার রাস্তায় গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে তৃণমূলকে ফিরিয়ে আনবেন না। নিজেদের পতাকা কিছু দিনের জন্য দূরে সরিয়ে রেখে পথে নামুন। ২৬-এ তৃণমূলকে বিসর্জন দিন।” তাঁর এই মন্তব্যে বিরোধী ঐক্যের উপর পরোক্ষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
‘আদি-নব্য’ বিভেদ দূরীকরণের চেষ্টা:
রাজ্য সভাপতি পদে বসেই শমীক ভট্টাচার্য দলের অভ্যন্তরীণ ‘আদি-নব্য’ দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কে নতুন, কে পুরনো, তা প্রাসঙ্গিক নয়। কে কমিটিতে রইলেন, কে কমিটিতে রইলেন না, প্রাসঙ্গিক নয়। কোনো বিজেপি নেতা তার পাড়ায়, তার বুথে প্রাসঙ্গিক কিনা সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।” কর্মীদের মনোবল বাড়াতে তিনি বলেন, “২০১১ সালে সিপিএমের ব্রিগেড দেখে কেউ ভাবতে পেরেছিলেন এই দলটা হারছে? ফলে এখন থেকেই তৈরি হন ২৬-এ তৃণমূলকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য।” তিনি হুঙ্কার দেন, “তৃণমূলের একতরফা লড়াই আর চলবে না। প্রয়োজনের লড়াই হবে। ওদের বিসর্জন জানানোর জন্য সেই লড়াই লড়তে হবে কর্মীদের।”
শুভেন্দুর আহ্বান: ‘প্রতি বুথে ৩০ জন যোদ্ধা’
২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে সকলকে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ডাক দিয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দলের কর্মীদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, “কপালের ওপরে নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার উপরে নয়, নিজেদের কর্মের ওপরে জোর দিতে হবে। প্রতি বুথে ৩০ জন যোদ্ধা তৈরি করে তৃণমূল হটাতে হবে। এটাই হোক শমীক ভট্টাচার্যকে আমাদের সংবর্ধনা।”
কেন শমীক? অভিজ্ঞতার জয়!
২০২১ সালে সুকান্ত মজুমদার সভাপতি হয়েছিলেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক ব্যক্তি দুই পদে থাকতে পারেন না। সুকান্ত মজুমদার বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ায় তাঁর সভাপতি পদে থাকা সম্ভব ছিল না। এই পরিস্থিতিতে শমীক ভট্টাচার্যকে বেছে নেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের বক্তব্য হলো, তাঁর ‘আদি’ ও ‘নব্য’ উভয় ধারার নেতাদের সঙ্গেই সু-সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, দলের দীর্ঘদিনের মুখ এবং রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র হিসেবে তাঁর দাপুটে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে তিনি রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ।
১৯৭৪ সালে হাওড়ার মন্দিরতলায় আরএসএস শাখায় যাতায়াত দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। সংঘ পরিবারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ২০০৬ সালে শ্যামপুকুর থেকে বিজেপির টিকিটে লড়লেও জয় পাননি। তথাগত রায়ের আমলে দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীকালে দিলীপ ঘোষ সভাপতি হলে মুখপাত্র হন। তবে তখনো দলের অভ্যন্তরে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ ছিল। অবশেষে বিজেপির রাজ্য সভাপতি হিসেবে গুরুদায়িত্ব নিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন শমীক ভট্টাচার্য। ২০২৬-এর আগে তিনি কতটা গুছিয়ে সংগঠন করতে পারেন এবং কিভাবে সহযোদ্ধাদের নিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে নামেন, তার দিকেই এখন বাংলার রাজনৈতিক মহলের নজর।