মানিকচকে বেসরকারি স্কুলের হস্টেলে ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু, শিক্ষকের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ

মালদার মানিকচকের একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হস্টেলে ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মৃত ছাত্র শ্রীকান্ত মণ্ডলের পরিবারের অভিযোগ, হস্টেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের নির্মম নির্যাতনেই তাদের ছেলে মারা গেছে। এই ঘটনায় শোকাহত পরিবার যথাযথ পুলিশি তদন্তের দাবি জানিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে।

ঘটনার বিবরণ:

মৃত ছাত্র শ্রীকান্ত মণ্ডল ভূতনির হীরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কেদারটোলা গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা শ্রীদাম মণ্ডল পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক এবং বর্তমানে দিল্লিতে কর্মরত। শ্রীকান্ত মানিকচকের ওই বেসরকারি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। বুধবার গভীর রাতে শ্রীকান্তর মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার। আজ (বৃহস্পতিবার) মানিকচক থানার পুলিশ দেহ ময়নাতদন্তের জন্য মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠিয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ:

শ্রীকান্তর দাদু প্রদীপ মণ্ডলের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে দিল্লি থেকে শ্রীদাম তাঁকে ফোন করে জানান যে, শ্রীকান্ত খুব অসুস্থ এবং তিনি যেন কাউকে তার কাছে পাঠান। বহু চেষ্টা করেও কাউকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শ্রীকান্তর পিসির ছেলে শত্রুঘ্নর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। খবর পেয়ে শত্রুঘ্ন দ্রুত বাইক নিয়ে শ্রীকান্তর মা এবং অন্য একজন আত্মীয়কে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

প্রদীপ মণ্ডল আরও জানান, “ওরা স্কুলে পৌঁছানোর আগেই স্কুলের এক শিক্ষক দিল্লিতে ফোন করে শ্রীকান্তর বাবাকে জানান, ওর ছেলে মারা গিয়েছে। শ্রীদাম ফের ফোন করে আমাদের সেই খবর দেয়।” তিনি অভিযোগ করেন, স্কুলে পৌঁছানোর পর এক শিক্ষক তাদের জানান যে, শ্রীকান্ত নাকি একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছিল এবং বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় খাবার জায়গায় অথবা ক্লাসে বাঁশি বা সিটি বাজিয়েছিল। কিন্তু কোনো ছাত্র তার নাম বলেনি। প্রদীপ মণ্ডলের দৃঢ় বিশ্বাস, এই ঘটনার জেরেই হস্টেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রীকান্তর উপর অত্যাচার করেছেন।

শ্রীকান্তর কাকা রামচন্দ্র মণ্ডলও একই সুর ধরেন। তিনি বলেন, “গরমের ছুটিতে ছেলে বাড়ি গিয়েছিল। ছুটি শেষের পর আর স্কুলে আসতে চাইছিল না। এই স্কুলে ওর নাকি ভালো লাগত না। অনেক বুঝিয়ে ছেলেকে স্কুলে পাঠানো হয়েছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, “বুধবার গভীর রাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ ফোন করে ছেলের বাবাকে জানায়, ছেলে খুব অসুস্থ। খানিক পর ফের জানায়, ছেলে মারা গিয়েছে। আমরা রাত দুটো নাগাদ ৪-৫ জন হাসপাতালে আসি। দেখি, স্কুল থেকে মৃত অবস্থায় শ্রীকান্তকে সেখানে আনা হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ছেলে নিজে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। আমাদের ধারণা, স্কুলের দাবি ঠিক নয়। হয় শিক্ষক ওর উপর অত্যাচার চালিয়েছেন অথবা তাকে এই কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। মনে হচ্ছে, এই ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের কোনো ত্রুটি রয়েছে। আমরা এর সঠিক কারণ জানতে চাই। যথাযথ পুলিশি তদন্ত দাবি করছি।”

পুলিশের তদন্ত:

এই ঘটনার খবর পেয়ে মানিকচক থানার আইসি-সহ অন্যান্য আধিকারিকরা স্কুলে যান। তাঁরা স্কুল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি মৃত ছাত্রের সহপাঠীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমের সামনে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

জেলা পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মৃত ছাত্রের পরিবারের তরফে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। অভিযোগ দায়ের হলে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হবে।

এই ঘটনা কোটার ছাত্রমৃত্যুর ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট ছাত্রদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে রাজ্যকে প্রশ্ন তুলেছিল। শ্রীকান্তর মৃত্যুর ঘটনা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্র নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে আনল।