বর্ষার শুরুতেই মালদায় ভয়ঙ্কর নদী ভাঙন, গঙ্গা নয়, এবার আতঙ্কের কারণ ‘ফুলহর’, মানিকচকে সিঁদুরে মেঘ

বর্ষা সবে শুরু হয়েছে, কিন্তু এরই মধ্যে মালদা জেলায় দেখা দিয়েছে ভয়ঙ্কর নদী ভাঙনের চিত্র। তবে এবার গঙ্গা নয়, আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফুলহর নদী। মানিকচক ব্লকের মথুরাপুরে গত কয়েকদিন ধরেই ফুলহরের তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে, যা মঙ্গলবার রাতে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নদীবাঁধের ১০০ মিটারেরও কম দূরত্বে ভাঙন শুরু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা এখন থেকেই ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখছেন।

জলের স্তর বৃদ্ধি ও ভাঙনের তীব্রতা:

বুধবার সকালে মানিকচক ঘাটে গঙ্গার জলস্তর ২২.২০ মিটার উচ্চতায় রেকর্ড করা হলেও, তেলজন্না ঘাটে ফুলহরের জলস্তর ছিল ২৩.৫৭ মিটার উচ্চতায়। জলস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুই নদীতেই স্রোত অনেক শক্তিশালী হয়েছে। এর প্রভাবে মথুরাপুরের শংকরটোলা ঘাটে ফুলহর নদী পাড় ভাঙতে শুরু করেছে। নদীবাঁধ থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরত্বে ভাঙন শুরু হওয়ায় প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ এলাকায় পাড় কাটছে নদী। পাঠানপাড়ার বাসিন্দারা এই পরিস্থিতিতে ব্যাপক আতঙ্কে রয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশাসনিক উদাসীনতা:

পাঠানপাড়ার বাসিন্দা নুর আলম চরম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। নদীপাড়ের এই এলাকায় গত বছরও ভাঙন হয়েছিল, বন্যাও হয়েছিল। বন্যার পর আমরা ব্লক অফিসে ফুলহরের ভাঙন পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলাম। জানুয়ারিতে একবার প্রশাসনিকভাবে সার্ভে করা হয়েছিল, কিন্তু তারপর আর কোনও অফিসার এখানে আসেননি, কোনও ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।” তিনি আশঙ্কা করছেন, “এভাবে চলতে থাকলে নদীর জল বাঁধে ঠেকতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এখন বাঁধ থেকে নদীর দূরত্ব ১০০ থেকে ১৫০ মিটার। এই বাঁধ কেটে গেলে গোটা মথুরাপুর ভেসে যাবে। এখনই কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সব হাতের বাইরে চলে যাবে।” বারবার প্রশাসনকে জানানোর পরও ফুলহরের ভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ।

স্থানীয় শেখ সেনাউল হকও একই সুর চড়িয়েছেন। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে নদীর অবস্থা খুব খারাপ। সেচ দফতরের লোকজন মাপজোক করে গেলেও ভাঙন রোধের কোনো কাজ এখনও হয়নি। সঠিক সময়ে কাজ না হলে পুরো মথুরাপুর বন্যায় ভেসে যাবে।” তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান, যাতে বন্যা আসার আগেই ভাঙন রোধের কাজ শেষ হয়।

পাঠানপাড়ার আরেক বাসিন্দা গোলাম মোস্তাফা শেখের কথায়, “গত দু’বছর ধরে আমরা নদী ভাঙনের যাবতীয় রিপোর্ট ব্লক প্রশাসনকে দিয়ে যাচ্ছি। প্রশাসনের লোকজন এসেছিলেন, বাঁধের মাপজোক করেছিলেন, কিন্তু কাজ এখনও পর্যন্ত হয়নি।” তিনি আরও যোগ করেন, “নদী থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে বাঁধ। এখনই বাঁধ রক্ষার কাজ না করা হলে বন্যা ঠেকানো যাবে না। নদীর জল একবার বাঁধ ছুঁয়ে ফেললে বাঁধ ভেঙে যাবেই। সেক্ষেত্রে শুধু মথুরাপুর অঞ্চল নয়, পার্শ্ববর্তী মানিকচক, নাজিরপুর, নুরপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাও পুরোপুরি ভেসে যাবে। তখন কিন্তু প্রশাসনকে আফসোস করতে হবে কেন সময় থাকতে বাঁধ রক্ষার কাজ করা গেল না।” কাজ শুরু না হওয়ার জন্য তিনি রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী এবং সেচ দফতরের কর্তাদেরকেই দায়ী করেছেন।

জেলা প্রশাসনের আশ্বাস:

এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জেলাশাসক নীতিন সিংহানিয়া আশ্বাস দিয়ে বলেন, “নদী ভাঙন প্রতিরোধে রাজ্য সরকারের তরফে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রতুয়া, ভূতনি-সহ মানিকচকের ভাঙন প্রবণিত এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে অস্থায়ী কাজ শুরু করা হয়েছে। ভাঙন রোধের স্থায়ী কাজের জন্য প্রশাসনের তরফে ডিটেইলড প্রোজেক্ট রিপোর্টও তৈরি করা হয়েছে।”

যদিও জেলা প্রশাসনের তরফে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই ভাঙন পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে বর্ষার মরসুমে মানিকচক অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।