বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্পের মশালবাহী, অনটনের মাঝেও বহুরূপী কৃষ্ণ বৈরাগীর আত্মোৎসর্গ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের পিসেমশাইয়ের বন্দুক হাতে বাঘরূপী শ্রীনাথ বহুরূপীকে শায়েস্তা করার গল্প আজ হয়তো শুধুই স্মৃতি। জেট গতির যুগে যখন রিল ভিডিওর ঝলকানিতে মানুষ বুঁদ, তখনও কলকাতার বাগুইআটির পঞ্চাশোর্ধ কৃষ্ণ বৈরাগী নামক এক প্রৌঢ় নীরবে বাঁচিয়ে রেখেছেন এক লুপ্তপ্রায় লোকশিল্প – বহুরূপী সেজে। দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী হলেও, নিজের ছন্দে, নিজের শর্তে এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি।
জীবন্ত মূর্তি: রেকর্ড ও শিল্পসত্তা:
কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও কার্ল মার্কস, আবার কখনও চার্লি চ্যাপলিন – কৃষ্ণের বহুরূপী সত্তা এমনই বৈচিত্র্যময়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির থেকে ‘লিভিং স্ট্যাচু’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া তাঁর কাছে শুধু একটি কাজ নয়, একনিষ্ঠ সাধনা। টানা ১৩ ঘণ্টা ‘লিভিং স্ট্যাচু’ হয়ে রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। আশ্চর্য হলেও সত্য, এতো গুণ আর প্রচেষ্টার পরও অনটন তাঁর পিছু ছাড়েনি। তবে তা তাঁর শিল্পীর মনে বিন্দুমাত্র হতাশা আনতে পারেনি।
ছেড়ে আসা স্বপ্ন আর শিল্পের টান:
ছেলেবেলা থেকেই কৃষ্ণের শখ ছিল বহুরূপী সাজার। অন্য খেলাধুলো ছেড়ে তিনি ‘যেমন খুশি সাজো’ প্রতিযোগিতায় নামতেন। কার্ল মার্কস, লেলিন, রবীন্দ্রনাথ, ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজি, এমনকি রামকৃষ্ণ দেব বা যিশুর সাজে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। দারোয়ান, কৃষক অথবা সাঁওতালের ভূমিকায়ও তিনি দক্ষতার সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করতেন। জ্যোতি বসু, বীরাপ্পন, বিদ্যাসাগর, মহাত্মা গান্ধির আদলেও সেজেছেন। নিজের মেকআপ নিজেই করেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও পোশাকও নিজেই বানান। জীবনের ২৬টা বছর বাগুইআটির এই প্রৌঢ় এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছেন।
সাফল্য ও আর্থিক সংগ্রাম:
রাজ্য ছাড়াও এই কাজের জন্য তিনি উত্তরপ্রদেশ, শিলং-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক পেয়েছেন। নিজের একটি দল তৈরি করে সেই দল নিয়েই ব্যস্ত থাকেন নিজের কাজে। এর পাশাপাশি, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে ৩০টিরও বেশি ফিল্মে অভিনয় করেছেন, গ্রুপ থিয়েটারেও তাঁর অবদান রয়েছে। টুকটাক গান করেন, এমনকি নিজের লেখা গানে সুরও দেন। প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী কুমার শানু তাঁর লেখা গানে সুর দিয়েছেন – এতো গুণ থাকা সত্ত্বেও একমাত্র সমস্যা, তাঁর নিদারুণ আর্থিক সংকট।
সামান্য একটু জমিতে টিনের ছাউনি ও বেড়া দেওয়া ঘরে স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কোনওরকমে সংসার চালাচ্ছেন। প্রায়ই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। কিন্তু এই আর্থিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি নিজের ছন্দে, নিজের শর্তে বাঁচতে ভালোবাসেন। অধিক আয়ের হাতছানি সত্ত্বেও, বহুরূপীর এই পেশাকেই তিনি আঁকড়ে ধরে রাখতে চান।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিল্পের বার্তা:
কৃষ্ণ বৈরাগী বলেন, “৩০টিরও বেশি সিনেমায় জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে অভিনয় করেছি। বহু নামীদামি শিল্পীর সংস্পর্শে এসেছি। তাঁদের ভালোবাসা পেয়েছি। বিভিন্ন ক্লাব সোসাইটি থেকে আমাকে সম্মান প্রদান করা হয়েছে।” তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই শিল্পীসত্তা, এই বহুরূপী সত্তাটাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এটি সঞ্চারিত করা। সেজন্যই তাঁর ভাই ও ভাইপো মাঝেমধ্যে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে পুজোর প্রোগ্রামগুলোতে, যোগ দেন।
“এটা ঠিক যে, এখন ইউটিউব, ফেসবুকের মতো সোশাল মিডিয়াতে ছোট ভিডিও পোস্ট করলে অনেক ভিউ পাওয়া যায়, সেখান থেকে পয়সা উপার্জনের পথ আছে। কিন্তু সে বিষয়টা আমাকে এতটা টানে না। ২৬টা বছর তো এভাবে কাটিয়ে দিলাম। আমার লোভ নেই। আমি অল্পতেই সন্তুষ্ট। এভাবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব,” – কৃষ্ণের কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়।
নামের সঙ্গেই কাজেও মিল কৃষ্ণ বৈরাগীর। তিনি নিজেই হাসতে হাসতে বললেন, ভগবান কৃষ্ণের মতোই তিনিও নানা রূপে অবতীর্ণ হন বিভিন্ন সময়ে। বহুরূপী সেজে ভালো-খারাপ সবরকম অভিজ্ঞতাই হয়েছে তাঁর। কেউ অবাক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে থাকেন, কেউ চিমটি কাটেন, আবার কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। তবুও এই প্রাচীন শিল্পেই তিনি খুঁজে পান বেঁচে থাকার রসদ। আর তাই, কেবল নিজের রুজি রোজগার নয়, আগামী প্রজন্মকেও এই পেশায় উৎসাহ দিয়ে চলেছেন তিনি। কৃষ্ণ বৈরাগী এক চলমান কিংবদন্তি, যিনি অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা এক শিল্পকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁর স্বপ্ন আর ভালোবাসার জোরে।