বীরভূমে সম্পর্কের রক্তাক্ত পরিণতি, প্রেমিকা খুন, প্রেমিকের আত্মহত্যা, কাঠগড়ায় দুই পরিবারের ‘মদত’?

বীরভূমের মাড়গ্রাম ও তারাপীঠ থানা এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় স্তম্ভিত এলাকাবাসী। প্রেমিকার ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হওয়ার পর গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হলো প্রেমিক। এই ঘটনায় পুলিশ প্রেমিকের বাবাকে আটক করেছে, যা ঘটনার পেছনে পরিবারের ‘মদত’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রেম, বিচ্ছেদ ও ভয়ঙ্কর অতীত:

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত প্রেমিকার নাম সুমিতা বায়েন (১৮), বাড়ি মাড়গ্রাম থানার বাতিনা গ্রামের বায়েন পাড়ায়। প্রেমিক বিক্রম মাল (২০), পার্শ্ববর্তী তারাপীঠ থানার খামেড্ডা গ্রামের বাসিন্দা। সুমিতা খামেড্ডা সংলগ্ন বুধিগ্রাম হাইস্কুলে পড়াশোনা করার সময়ই বিক্রমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পড়া ছাড়ার পরও তাদের মধ্যে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং দুই পরিবারও তাদের সম্পর্কের বিষয়ে অবগত ছিল।

তবে, তাদের ভালোবাসায় ছেদ পড়ে প্রায় দুই বছর আগে এক খুনের ঘটনায়। খামেড্ডা গ্রামে ঘটে যাওয়া সেই খুনের ঘটনায় বিক্রমের নাম জড়িয়েছিল। এই বিষয়টি জানার পর সুমিতা সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরই সুমিতার পরিবার অন্যত্র তার বিয়ে ঠিক করে, যা আগামী ৬ জুলাই মুর্শিদাবাদের খড়গ্রাম থানার তেলসুন্দি গ্রামে হওয়ার কথা ছিল।

নাছোড়বান্দা বিক্রমের উৎপাত ও পরিবারের হস্তক্ষেপ:

সুমিতার অন্যত্র বিয়ের ঠিক হওয়ার পরও বিক্রম প্রতিনিয়ত তাকে ফোনে বিরক্ত করত এবং হুমকি দিত। বাধ্য হয়ে সুমিতার পরিবার খামেড্ডা গ্রামে গিয়ে বিক্রমের বাবা তপন মাল এবং মা মালতি মালকে মেয়ের অমতের কথা জানিয়ে আসে। একইসঙ্গে সুমিতার অন্যত্র বিয়ে ঠিক হওয়ার কথাও জানায়। এরপরও বিক্রমের উৎপাত বন্ধ না হওয়ায় চারদিন আগে বিষয়টি তারাপীঠ থানা পর্যন্ত গড়ায়। পুলিশ উভয় পক্ষকে ডেকে মীমাংসা করে দেয় এবং বিক্রমকে সুমিতাকে আর বিরক্ত না করার নির্দেশ দেয়।

মর্মান্তিক পরিণতি:

কিন্তু সেই মীমাংসা স্থায়ী হয়নি। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা নাগাদ ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাতিনা গ্রামে সুমিতাদের বাড়িতে যায় বিক্রম। সেই সময় সুমিতা খেয়ে হাত ধুতে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিল। এই সুযোগে বিক্রম তাকে ধরে ফেলে এবং একের পর এক ধারালো অস্ত্রের কোপ মারে। রক্তাক্ত অবস্থায় কোনক্রমে বাড়িতে ছুটে গিয়ে ঘটনাটি জানায় সুমিতা। পরিবারের লোকজন তাকে তৎক্ষণাৎ রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানেই চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে।

ঘটনার পরই বিক্রম পালিয়ে যায়। শুক্রবার সকালে তারাপীঠ থানার সাহাপুর গ্রামের কাছে রাস্তার ধারে থাকা একটি কাঠ মিলের মধ্যে বিক্রমের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবারের দাবি ও শোকের আবহ:

সুমিতার কাকিমা অপর্ণা বায়েন অভিযোগ করে বলেন, “বিক্রমের পরিবারের মদতে সুমিতাকে বিরক্ত করত বিক্রম। আমরা ওর পরিবারের সকলের শাস্তি চাই।” এই অভিযোগ ঘটনার পেছনে আরও বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় দুই পরিবারেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি প্রেমের সম্পর্ক যেভাবে খুন ও আত্মহত্যার মধ্যে দিয়ে শেষ হলো, তা এলাকায় এক গভীর আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পুলিশের তদন্তে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় স্থানীয়রা।