“কয়েকজনের দোষে কেন ২৬ হাজার সাজা পাবে?”-অভিষেকের প্রশ্ন এবার ‘চাকরি বাতিল’ নিয়ে

রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের ঘটনায় এবার কড়া ভাষায় মুখ খুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্পষ্ট প্রশ্ন, “কিছু মানুষের দোষের সাজা কেন সবাই পাবেন?” তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ১০০ দিনের কাজ ও আবাস যোজনার টাকা আটকে রাখার মতোই শিক্ষক নিয়োগের বিতর্কেও একই প্রবণতা দেখছেন বলে মন্তব্য করেছেন।

বুধবার ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে গত ১১ বছরের কাজের খতিয়ান সম্বলিত প্রায় সাতশো পাতার বই ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে অভিষেক এই বিতর্কিত বিষয়ে প্রথমবার মুখ খোলেন। সাতগাছিয়ার এই জনসভায় তিনি বলেন, “কিছু লোক অর্থের বিনিময়ে চাকরি পেয়েছে, তাই পুরো প্যানেল বাতিল হলো! আমি যদি বলি, দিল্লি হাইকোর্টের যে বিচারপতি যশোবন্ত বর্মার বাড়িতে আগুন লেগেছিল, ফায়ার ব্রিগেড গিয়েছিল, তাঁর বাড়িতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাওয়া গিয়েছে। একজন বিচারপতি যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তা হলে সমগ্র বিচারব্যবস্থাই যে দুর্নীতিগ্রস্ত, তা নয়।”

অভিষেক আরও বলেন, “কয়েকজন যদি অসাধু উপায়ে চাকরি পায়, তা হলে আপনি ২৬ হাজার লোকের মুখ থেকে অন্নের গ্রাস ছিনিয়ে নিতে পারেন না। একজন–দু’জন ভুল করলে আপনি সবাইকে শাস্তি দিতে পারেন না।” তাঁর যুক্তি, কয়েকজনের দুর্নীতিকে ‘জেনারালাইজ়’ করে সবাইকে দায়ী করা যায় না। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “একজন সাংসদ যদি ভুল করেন, আপনি কি সংসদ তুলে দেবেন? একজন বিধায়ক ভুল করলে বিধানসভা তুলে দেবেন? একজন পঞ্চায়েত সদস্য ভুল করলে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থাই তুলে দেওয়া হবে? তা তো হয় না।”

অভিষেকের এই যুক্তিকে সমর্থন করেছেন চাকরিহারা শিক্ষকদের একটি বড় অংশ। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তথাকথিত ‘নন-টেন্টেড’ বা ‘যোগ্য’ চাকরিহারা শিক্ষকদের আন্দোলনের অন্যতম নেতা শুভজিৎ দাস বলেছেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একদম সঠিক কথা বলেছেন। আমাদেরও কথা সেটাই। উনি সরকার পক্ষেরই একজন। তাই সরকারকে উনি বলুন, যাতে যোগ্যদের চাকরি বাঁচানো যায়।” চাকরিহারা শিক্ষাকর্মী সুজয় সর্দারও একই সুরে বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই যুক্তি সঠিক। কয়েকজন যদি অনিয়ম করে, তার দায় কখনও সবার ঘাড়ে পড়তে পারে না।”

প্রসঙ্গত, চাকরি বাতিল হওয়া শিক্ষাকর্মীদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার মাসিক ভাতা (গ্রুপ-সি কর্মীদের জন্য ২৫ হাজার এবং গ্রুপ-ডি কর্মীদের জন্য ২০ হাজার টাকা) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট গত সপ্তাহেই তাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একশো দিনের কাজের টাকা (রাজ্যের কোষাগার থেকে) দিলে আটকাতে হবে! আবাসের টাকা দিলে আটকাতে হবে! এই সরকার চাকরি দিলে কোর্টে আটকাতে হবে! যাঁদের চাকরি চলে গিয়েছে, তাঁদের যদি সরকার আর্থিক সহায়তা দেয়, সেটা আবার মামলা করে আটকাতে হবে! তৃণমূল আপনাকে সাহায্য করতে চায় আর বিজেপি মানুষের মুখ থেকে ভাতের গ্রাস ছিনিয়ে নিতে চায়— এটাই পার্থক্য।”

অভিষেকের এই মন্তব্য শিক্ষক নিয়োগ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে, যা আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।