বিশেষ: বুধবার কখন শেষ হবে অম্বুবাচী? জেনেনিন নিবৃত্তির পর কী কী নিয়ম পালন করতে হয়?

আষাঢ় মাসের আগমন মানেই বাঙালি হিন্দু সমাজে অম্বুবাচীর আবাহন। লোকবিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় বিধান মেনে গত ২২শে জুন থেকে শুরু হওয়া ধরিত্রী মায়ের ঋতুমতী হওয়ার এই বিশেষ পর্ব, অম্বুবাচী, আজ, ২৫শে জুন রাতে (রাত ৩:২১ মিনিটে) তার নিবৃত্তি অর্থাৎ সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। এই তিন দিনের অম্বুবাচী পালন পর্ব সনাতন ধর্মে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা নারীশক্তি ও পৃথিবীর উর্বরতার প্রতীক।

হিন্দু ধর্ম এবং বৈদিক শাস্ত্রে পৃথিবীকে ‘মা’ রূপে সম্বোধন করা হয়। পৌরাণিক যুগ থেকেই ধরিত্রীকে ‘ধরিত্রী মাতা’ বলে সম্মান জানানো হয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, আষাঢ় মাসের ৭ তারিখে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে এবং চতুর্থ পদে সূর্য মিথুন রাশিতে গমন করলে পৃথিবী বা ‘ধরিত্রী মা’ রজঃস্বলা হন। পূর্ণবয়স্কা নারী যেমন সন্তান ধারণে সক্ষম হন, তেমনই অম্বুবাচীর পর ধরিত্রীও শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠেন এবং নতুন ফসল ফলানোর জন্য প্রস্তুত হন। এই কারণেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ‘রজঃউৎসব’ নামেও পালিত হয়। বাংলা প্রবাদে এর গুরুত্ব বোঝাতে বলা হয়, “কিসের বার কিসের তিথি, আষাঢ়ের সাত তারিখ অম্বুবাচী।”

কামাখ্যা মন্দিরে বিশেষ আয়োজন:

তন্ত্র সাধনার অন্যতম পীঠ, আসামের গুয়াহাটিতে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির এই অম্বুবাচীর সময়কালে এক বিশেষ মহোৎসবের আয়োজন করে। কালিকাপুরাণ অনুসারে, কামাখ্যা দেবী মহাশক্তিরই অংশ। অম্বুবাচীর তিন দিন দেবীর ঋতুস্রাব হয় বলে বিশ্বাস করা হয়, এবং এই সময়ে মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকে। দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই মহা মেলায় ভিড় জমান দেবীর আশীর্বাদ লাভের জন্য। শুধু কামাখ্যা নয়, অম্বুবাচী চলাকালীন বিভিন্ন মন্দির ও বাড়ির ঠাকুর ঘরের মাতৃশক্তির প্রতিমা বা ছবি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ব্যতিক্রম শুধু তারাপীঠ মন্দির, যেখানে অম্বুবাচীর সময়েও নিত্য পুজো চলতে থাকে।

অম্বুবাচীর আচার ও নিষেধ:

ঋতুকালে নারীরা যেমন অশুচি থাকেন বলে মনে করা হয়, তেমনই অম্বুবাচীর তিন দিন পৃথিবীকেও অশুচি জ্ঞান করা হয়। এই কারণেই ব্রহ্মচারী, সাধু, সন্ন্যাসী, যোগীপুরুষ এবং বিধবা মহিলারা এই সময় ‘অশুচি’ পৃথিবীর উপর আগুনের রান্না করা কোনো খাবার গ্রহণ করেন না। তারা সাধারণত ফলমূল খেয়ে এই তিন দিন কাটান। বহু পরিবারে এখনও বয়স্ক বিধবা মহিলারা অম্বুবাচী উপলক্ষে কঠোর ব্রত পালন করেন। এই কয়েকদিন কোনো প্রকার শুভ কাজ যেমন বিবাহ, গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি নিষিদ্ধ থাকে। কৃষিকাজও এই সময় বন্ধ রাখা হয়, কারণ মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধার হচ্ছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

অম্বুবাচীর নিবৃত্তি হলে, অর্থাৎ আজ রাত ৩টা ২১ মিনিটের পর থেকে, পুনরায় সমস্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান ও চাষাবাদ শুরু করা যাবে। বিধবা মহিলারা নিজেদের জামাকাপড়, বিছানা সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে এবং সাবান-শ্যাম্পুতে স্নান করে সবকিছুতে হাত দেন। কামাখ্যা সহ সমস্ত সতীপীঠ এবং মন্দিরের দ্বার পুনরায় ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

ধরিত্রী মায়ের উর্বরতা ও নারীশক্তির এই বাৎসরিক উদযাপন শেষ হওয়ার সাথে সাথে নতুন করে শুরু হবে প্রাণের স্পন্দন, যা প্রকৃতির চিরন্তন চক্রেরই এক অংশ।