“যে কোনও মুহূর্তে খুন হতে পারেন!”-প্রাণহানির আশঙ্কায় নিজের উত্তরসূরি বাছলেন খামেনেই

ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের আবহে তেহরানে চলছে চরম টানাপোড়েন। আর এই আবহের মাঝেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের একটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র জল্পনার জন্ম দিয়েছে। নিজের প্রাণনাশের আতঙ্কে ভুগছেন এমন জল্পনার মধ্যেই তিনি তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিন জন শীর্ষস্থানীয় ধর্মগুরুর নাম প্রস্তাব করেছেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই তালিকায় খামেনেইয়ের নিজের ছেলের নাম নেই। তিন দশকের শাসনামলে খামেনেইয়ের এমন অনিশ্চয়তা আগে কখনও দেখা যায়নি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আড়ালে মেঘনাদ? বাঙ্কারেই কি খামেনেই?
সূত্রের খবর, ইসরায়েলের সাথে তীব্র হুঙ্কার দিলেও আয়াতোল্লাহ খামেনেই বর্তমানে আড়ালে রয়েছেন, অনেকটা পৌরাণিক চরিত্র মেঘনাদের মতো। তিনি নাকি একটি সুরক্ষিত বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন এবং তার অবস্থান গোপন রাখতে আশেপাশের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তকে তার “জরুরি যুদ্ধ পরিকল্পনার” অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পদক্ষেপ থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, তিনি ইসরায়েল বা আমেরিকা থেকে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে কতটা সতর্ক। অনেকেই মনে করছেন, খামেনেই ধরেই নিয়েছেন যে কোনো মুহূর্তে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে, এবং সেক্ষেত্রে তিনি এটিকে “সম্মানের সঙ্গে মৃত্যু” হিসেবে দেখাতে চাইছেন।
ছেলের উপর অনাস্থা? রাইসির বংশধরের দিকে নজর?
দীর্ঘদিন ধরেই আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মুজতবা খামেনেইয়ের নাম আলোচনায় ছিল। মুজতবা নিজেও একজন ধর্মগুরু এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাবা তাঁর উপর ইরানের কর্তৃত্ব সঁপে দেওয়ার ভরসা করতে পারেননি, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
অন্যদিকে, ইরানের প্রাক্তন রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু ২০২৪ সালের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। তাহলে কি নিজের ছেলের উপর আস্থা না রাখলে আয়াতোল্লাহ খামেনেই ইব্রাহিম রাইসির বংশধরকেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দেখতে চান? যদিও খামেনেই কোন তিনজনের নাম প্রস্তাব করেছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের প্রস্তুতি
গত ১৩ জুন ইসরায়েল কর্তৃক প্রথম ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার পর থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই চলছে। এই সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে ইরানের একাধিক সামরিক কর্তা নিহত হয়েছেন এবং তাদের পরিবর্তিত মুখও খামেনেই ইতিমধ্যেই বেছে নিয়েছেন। এবার তিনি নিজের উত্তরসূরিও ঠিক করে ফেললেন। সূত্রের খবর, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খামেনেই নিহত হলে ওই তিনজনের মধ্য থেকেই কাউকে ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হতে পারে।
গুঞ্জনে যে নামগুলো উঠে আসছে
খামেনেই সরাসরি নাম প্রকাশ না করলেও তার ঘনিষ্ঠ এবং শীর্ষস্থানীয় কিছু ধর্মগুরুর নাম ঘিরে গুঞ্জন চলছে। এদের মধ্যে রয়েছেন:
- আলিরেজা আরাফি: খামেনেইয়ের ডান হাত হিসেবে পরিচিত। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েকশিয়ানের সরকারকে পরামর্শ দানকারী বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং উপদেষ্টা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন।
- আলি আসগর হেজাজি: আয়াতোল্লাহর দফতরে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক সমস্ত পদক্ষেপ পর্যালোচনার দায়িত্ব তার কাঁধে।
- মহম্মদ গোলপায়েগানি: খামেনেইয়ের দফতরের ‘চিফ অফ স্টাফ’ হিসেবে ইরান সরকারের যাবতীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ পর্যালোচনা করেন তিনি।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ধর্মীয় সংগঠন ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’কে খামেনেই ইতিমধ্যেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করেছেন বলে জানা গেছে। এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ তেহরানের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি এবং সর্বোচ্চ নেতার গভীর উদ্বেগকে আরও প্রকট করে তুলেছে।