দুর্ঘটনাস্থলে মোদী, আহতদের দেখতে গেলেন হাসপাতালেও, বিমান ভাঙার নেপথ্যে কোন ‘কারণ’?

এক লহমায় শেষ হয়ে গেল ২৪১টি তাজা প্রাণ। আহমেদাবাদের মাটি ছুঁয়েছিল এক দুঃস্বপ্নের ছায়া, যখন এয়ার ইন্ডিয়ার AI171 (Boeing 787-8, VT-ANB) বিমানটি মেঘানিনগরে একটি মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলে আছড়ে পড়ে। ভয়াবহ সেই বিমান দুর্ঘটনায় ভস্মীভূত হয়ে যান বিমানের সকল যাত্রী। আজ, এই শোকবিহ্বল মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন। তাঁর চোখে মুখে স্পষ্ট বেদনার ছাপ, রুমাল দিয়ে চোখ মুছতেও দেখা গেছে তাঁকে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গোটা দেশ শোকে স্তব্ধ।
প্রধানমন্ত্রী দুর্ঘটনার স্থল, যেখানে বিমানটি ভেঙে পড়েছে, সেই মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল চত্বর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুর্ঘটনার একমাত্র জীবিত ব্যক্তির সঙ্গেও দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এয়ার ইন্ডিয়ার শীর্ষকর্তা এবং অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রীও। তাঁদের উপস্থিতি শোকস্তব্ধ পরিবেশকে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।
রহস্যের কেন্দ্রে ‘কনফিগারেশন এরর’: কীভাবে একটি ছোট ত্রুটি কেড়ে নিল এতগুলো প্রাণ?
প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে একটি ছোট যান্ত্রিক ত্রুটি, যাকে ‘কনফিগারেশন এরর’ বলা হচ্ছে, তা এত বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে? এয়ার ইন্ডিয়ার Boeing 787-8 ড্রিমলাইনার, যা অত্যাধুনিক এবং দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার জন্য তৈরি, তাতে ছিল GE GEnx ইঞ্জিন। আহমেদাবাদ থেকে ৪২০০ কিলোমিটার আকাশপথ পাড়ি দিয়ে লন্ডন যাচ্ছিল এই বিমানটি। বিমানের দুই অভিজ্ঞ পাইলট, ক্যাপ্টেন সুমীত সভরওয়াল এবং ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দর, দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। আকাশ ছিল পরিষ্কার, তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা উড়ানের জন্য অনুকূল। অথচ, মাত্র ৫ থেকে ৯ মিনিটের মধ্যে সব শেষ!
কিন্তু কী এই ‘কনফিগারেশন এরর’?
কনফিগারেশন এরর হলো টেক অফের সময়কার এমন এক যান্ত্রিক ত্রুটি যা উড়ানে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে ফ্ল্যাপসের ভুল সেটিং, কম থ্রাস্ট, সময়ের আগে টেক অফ (রোটেশন) অথবা ল্যান্ডিং গিয়ার না ওঠানোর মতো ভুলগুলি অন্তর্ভুক্ত। এই ছোট ছোট ভুলগুলি উড়ান এবং উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর কোনো একটিতে সামান্য ভুল হলেও উড়ান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে।
ঘটনার পরম্পরা এবং অজানা প্রশ্ন
বিমানটি মাত্র ৮২৫ ফুট উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছিল এবং গতিবেগ ছিল ৩২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা, যা বোয়িং বিমানের স্বাভাবিক গতিবেগের চেয়ে কম। ছবিতে দেখা গেছে, বিমানটির ল্যান্ডিং গিয়ার নিচের দিকে ছিল, যা টেক অফের পর উপরে উঠে যাওয়ার কথা। এই অনিয়মগুলিই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ‘কনফিগারেশন এরর’-কে আরও বেশি করে সামনে আনছে।
কেন কনফিগারেশন এরর এত গুরুত্বপূর্ণ?
টেক অফ উড়ানের সবচেয়ে জরুরি পর্ব। এই সময় ফ্ল্যাপস, থ্রাস্ট এবং রোটেশন স্পিড সঠিক ভাবে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য ত্রুটিগুলির মধ্যে রয়েছে:
ফ্ল্যাপসের ভুল সেটিং: ফ্ল্যাপস কম থাকলে উড়ান সঠিকভাবে সম্ভব হয় না, আবার বেশি থাকলে উপরে উঠতে সমস্যা হয়। আহমেদাবাদের মতো শহরে যে সেটিংস হওয়া উচিত ছিল, তা সঠিক ছিল কিনা, তা এখনও জানা যায়নি।
ক্রসচেক এবং ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম: পাইলটরা সমস্ত চেক ভালোভাবে করেছিলেন কিনা, ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ করছিল কিনা, তা তদন্তের বিষয়।
পাইলটদের ক্লান্তি বা চাপ: পাইলটরা ক্লান্ত ছিলেন কিনা, অথবা দ্রুত উড়ানের কোনো চাপ ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রোটেশন: রোটেশন ঠিকমতো হয়েছে কিনা, অর্থাৎ বিমান সঠিক কোণে উপরের দিকে উঠে গিয়েছিল কিনা, তা-ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে জরুরি।
বর্তমানে, ব্ল্যাক বক্সের সন্ধানে প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার হলেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে এবং উঠে আসবে অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর। এই মর্মান্তিক ঘটনা বিমান সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, এবং দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে প্রকৃত সত্যের উন্মোচনের জন্য।