উত্তর-পূর্বে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি! বন্যা-ভূমিধসে বিপদের মুখে জনজীবন, চলছে উদ্ধারকার্য

উত্তর-পূর্ব ভারত যেন এক গভীর জলের তলায় হাঁপাচ্ছে। গত কয়েকদিনের অঝোর ধারাপাতে অসম, অরুণাচল, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা – এই রাজ্যগুলির বিস্তীর্ণ প্রান্ত আজ বন্যার জলে থৈ থৈ করছে, আর পাহাড়ে ধস নামছে যেন প্রকৃতির নির্মম অভিশাপ। প্রশাসনের দেওয়া শুকনো সংখ্যা বলছে, মৃতের মিছিল ৩৪-এ ঠেকেছে, তবে বাস্তুহারা মানুষের আর্তনাদ সেই সংখ্যাকেও যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ খোলা আকাশের নীচে, তাদের ভিটেমাটি জলমগ্ন, ফসলের ক্ষেত জলের তলায়, আর যোগাযোগের জাল ছিন্নভিন্ন।

অসমের কান্না যেন থামছেই না। রাজ্যের ২৮টি জেলা, প্রায় আড়াই হাজার গ্রাম আজ জলের বন্দী। এগারো লক্ষের বেশি মানুষ সর্বস্বান্ত। ব্রহ্মপুত্র যেন ফুঁসছে, তার সঙ্গী অন্যান্য নদীগুলিও বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে বইছে। রাস্তাঘাট জলের তলায়, তাই ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রকৃতির এই তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি কাজিরাঙাও। বনের পশুরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে লোকালয়ের দিকে। গুয়াহাটি শহরের অবস্থাও সঙ্গীন। গত শুক্রবারে ৬৭ বছরের মধ্যে রেকর্ড ১১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত দেখেছে শহরবাসী। বহু মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে ত্রাণ শিবিরে, চলছে জোরকদমে উদ্ধারকার্য।

ত্রিপুরাও যেন জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। রাজধানী আগরতলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া হাওড়া নদীর জল বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। দশ হাজারের বেশি মানুষ ঠাঁই নিয়েছেন ত্রাণ শিবিরে। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা নিজে ছুটে গিয়েছেন দুর্গত এলাকায়, খতিয়ে দেখছেন প্রশাসনিক তৎপরতা। গোমতী, খোয়াই, সিপাহিজলা, উত্তর ত্রিপুরা – এই জেলাগুলিতে ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বিদ্যুৎ নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

অরুণাচলের পাহাড়ে নেমেছে ধসের আতঙ্ক। কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের প্রাণ, একই পরিবারের একাধিক সদস্যও বাদ যাননি। মেঘালয়েও ভূমিধস আর বন্যায় রাস্তাঘাট বন্ধ। মণিপুরেও প্রায় তিন হাজার মানুষ ঘরছাড়া, গত ৪৮ ঘণ্টায় ভেঙে পড়েছে ৮৮৩টি বাড়ি। ঘূর্ণিঝড় রেমালের জের টেনে এনেছে মিজোরাম, সেখানেও ভারী বৃষ্টি আর ধসে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন।

এই দুর্যোগের মুহূর্তে ত্রাতা হয়ে উঠেছে ভারতীয় বায়ুসেনা, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF), NDRF এবং স্থানীয় প্রশাসন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধারকাজ, নিরাপদে সরানো হচ্ছে দুর্গতদের, বিলি করা হচ্ছে ত্রাণসামগ্রী। তবে আকাশের মুখ এখনও ভার, ফের ভারী বৃষ্টি আর নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

আবহাওয়া দফতর অসমে জারি করেছে লাল ও কমলা সতর্কতা। উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যেও কমলা ও হলুদ সতর্কতা বহাল। আগামী কয়েকদিন আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস, তাই রাজ্যগুলিতে সতর্কতা আরও জোরদার করা হয়েছে। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি কবে শান্ত হবে, সেই দিকেই তাকিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ।