শিক্ষক নিয়োগের বিধিতে বড় বদল, স্বচ্ছতা আনতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিলো SSC

দুর্নীতির কালোছায়া কাটিয়ে রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনলো স্কুলশিক্ষা দপ্তর। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর প্যানেল বাতিলের পর, ওএমআর মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়া স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) এবার ঢেলে সাজিয়েছে নিয়োগের বিধি। প্রকাশিত হয়েছে উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক নিয়োগের নতুন নিয়মাবলী, যা স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
পুরনো ত্রুটি শুধরে নতুন দিশা
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে স্কুলশিক্ষা দপ্তরের প্রধান সচিব বিনোদ কুমার স্বাক্ষরিত নতুন নিয়োগ বিধি প্রকাশিত হয়েছে। এই বিধিতে কেবল লিখিত পরীক্ষা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ইন্টারভিউয়ের ওপরই নয়, ক্লাসরুম ডেমো এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি চাকরিপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ এবং আইনজীবী মহলের কাছে স্বস্তির খবর।
অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জন্য নতুন দিগন্ত
নতুন নিয়মে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগে ক্লাসরুম ডেমো এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার জন্য প্রতিটিতে ১০ নম্বর করে মোট ২০ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। এর ফলে শুধু স্থায়ী শিক্ষকরাই নন, রাজ্যজুড়ে শিক্ষক-শিক্ষিকার আকালে দীর্ঘকাল ধরে পাঠদান করে আসা চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নিয়োগের সুযোগ পাবেন। এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার এক বিরাট শূন্যতা পূরণে সহায়তা করবে। উল্লেখ্য, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষাতেও একই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার, যিনি বর্তমানে এসএসসি-র চেয়ারম্যান।
স্বচ্ছতার প্রশ্নে আপোসহীন পদক্ষেপ
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এসএসসি এই প্রথমবার ওয়েবসাইটে ইন্টারভিউ তালিকা ও প্যানেল প্রকাশ করবে। গত দেড় দশক ধরে বিরোধীরা এ নিয়ে বারবার সরব হয়েছিল, অভিযোগ ছিল যে নিয়োগ দুর্নীতি নিশ্চিত করতেই লিখিত পরীক্ষায় সফল প্রার্থীদের তালিকা এবং ইন্টারভিউয়ের পর প্যানেল প্রকাশ করা হতো না। কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চে এসএসসি নিজেই জানিয়েছিল যে, যাদের নাম তারা সুপারিশ করেনি, এমন অনেককেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদ নিয়োগপত্র দিয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওএমআর সংরক্ষণ ও প্যানেলের মেয়াদ
স্কুলশিক্ষা দপ্তর প্রকাশিত নতুন বিধিতে বলা হয়েছে, উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে নিয়োগ প্যানেলের মেয়াদ হবে এক বছর। এসএসসি চাইলে প্যানেলের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এরপর ওএমআর-এর হার্ড কপি আরও দু’বছর সংরক্ষণ করতে হবে কমিশনকে। এছাড়া, ওএমআর-এর স্ক্যান্ড (ডিজিটাল) কপি দশ বছর সংরক্ষণ করবে এসএসসি। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ওএমআর সংরক্ষণের সময়সীমা বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
পরীক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন
নতুন নিয়োগ বিধিতে আরও বলা হয়েছে যে, লিখিত পরীক্ষার পরেই ওএমআর-এর ডুপ্লিকেট কপি শিক্ষক পদে আবেদনকারী প্রার্থীদের হাতে হাতে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হওয়ার আগেই মডেল আনসার-কি কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যা প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জও করতে পারবেন। এমনকি, দশটি শূন্যপদের জন্য এবার থেকে ১৪ থেকে ১৬ জনের প্যানেল বেরোবে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনবে।
এই নতুন বিধি নিঃসন্দেহে রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং যোগ্য প্রার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।