হু হু করে গলছে বরফ! সাফ হতে পারে পাহাড়ের চুড়ো, কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সংকটে

বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়াবহ প্রভাবে দ্রুত হারে গলে যাচ্ছে হিন্দুকুশ হিমালয়ের বরফ, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য সুদূরপ্রসারী হুমকি তৈরি করছে। নতুন একটি গবেষণা বলছে, যে হারে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে আর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিশাল পর্বতমালার সিংহভাগ বরফ তরল হয়ে নিম্নাভিমুখে নেমে আসবে।

সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, যদি বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহলে হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলি দ্রুত গলতে শুরু করবে। এই হিমবাহ থেকেই সৃষ্ট নদীগুলোই বহু মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি। প্রায় ২০ কোটি মানুষের ভাত-রুটির জোগান নির্ভর করে এই হিমবাহ থেকে তৈরি নদীগুলির ওপর। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা সত্যি হলে, এই শতাব্দীর শেষাশেষি, হিন্দুকুশের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বরফ গলে জল হয়ে যেতে পারে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবী এখনকার থেকে ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হবে। এমনটা হলে সারা বিশ্বে যত হিমবাহ আছে, তার মাত্র এক-চতুর্থাংশ অবশিষ্ট থাকবে। জলবায়ু যেভাবে বদলাচ্ছে, তাতে ইউরোপীয় আল্পস, পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার রকি পর্বতমালা এবং আইসল্যান্ডের হিমবাহগুলোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হিন্দুকুশ হিমালয়কে “পৃথিবীর তৃতীয় মেরু” বলা হয় কারণ সুমেরু ও কুমেরুর পর এটিই পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম বরফভাণ্ডার। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এভারেস্ট, কারাকোরামের মতো পৃথিবীর দুই সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতাও কমছে এবং সুমেরু ও কুমেরুর বরফও গলছে। এবার হিন্দুকুশ হিমালয়ের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

তবে, গবেষণায় একটি আশার আলোও দেখানো হয়েছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখার যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছিল, তা অর্জন করা গেলে এই সব অঞ্চলে কিছু হিমবাহের বরফ সংরক্ষণ সম্ভব।

শুক্রবার থেকে তাজিকিস্তানে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের হিমবাহ সম্মেলন। এই ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা চলছে, যেখানে ৫০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত আছেন। Asian Development Bank-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াং এই সম্মেলনে বলেন, হিমবাহ এই হারে গলতে শুরু করলে কয়েক বিলিয়ন মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে যাবে, যার মধ্যে এশিয়ার ২ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবিকা এই হিমবাহের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বিশ্ব উষ্ণায়ন কমাতে নির্গমন কমাতে এই মুহূর্তে ক্লিন এনার্জির উপর ভরসা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

উল্লেখ্য, এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ১০টি দেশের ২১ জন বিজ্ঞানীর একটি দল। তাঁরা আটটি হিমবাহ মডেল ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ২,০০,০০০ এরও বেশি হিমবাহের সম্ভাব্য বরফ ক্ষয় নিয়ে গবেষণা করেন।

অর্থাৎ, আর ৮০ বছরও বাকি নেই। এর মধ্যেই হিন্দুকুশ ও অন্যান্য সুউচ্চ পর্বতমালার বরফ পুরোপুরি গলে যেতে পারে। যদি বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রার বৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে বিপদের মাত্রা হয়তো একটু কমতে পারে। তবে তাহলেও ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিন্দুকুশ পর্বতমালার অর্ধেকের বেশি বরফ গলিয়ে দিতে পারে।