SSC-র চাকরিহারা ‘অযোগ্যদের’ হয়েও কোর্টে লড়বে রাজ্য? রিভিউ পিটিশন নিয়ে চলছে আলোচনা

কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা ‘অযোগ্য’ বা ‘টেন্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বেতনের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলেও, সুপ্রিম রায়ের ৫৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনো ‘টেন্টেড’ প্রার্থী টাকা ফেরত দেননি। এমনকি রাজ্য সরকারও সেই টাকা আদায়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি আশ্বাস দিয়েছেন যে, রাজ্য সরকার এই শিক্ষকদের অন্য দপ্তরে নিয়োগের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে, রাজ্য সরকার চাকরিহারা প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর হয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে।

রিভিউ পিটিশনে রাজ্যের সম্ভাব্য যুক্তি:

বিকাশ ভবন সূত্রে খবর, রাজ্য সরকার এই রিভিউ পিটিশনের শুনানিতে শুধু যারা নিশ্চিতভাবে ‘অযোগ্য’ নন, তাদের পাশাপাশি ‘টেন্টেড’ হিসেবে চিহ্নিতদের হয়েও জোরদার সওয়াল করবে। সূত্রের দাবি, রাজ্য সরকার চাইছে যাতে এই ‘অযোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বেতনের টাকা ফেরত দিতে না হয়।

রাজ্য সরকার যে যুক্তিতে সওয়াল করতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো:

এই শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা অন্তত পাঁচ বছর ধরে কাজ করেছেন এবং তার বিনিময়ে বেতন পেয়েছেন। এখন সেই টাকা ফেরত চাইতে বলাটা তাঁদের দিয়ে ‘বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে নেওয়ার’ শামিল, যা ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী।
কাজের বিনিময়ে পাওয়া টাকা এত বছর বাদে ফেরত দিতে বললে তা ‘অন্যায্য’ এবং ‘অবিচার’ করা হবে।
সেই বেতনের টাকা ইতিমধ্যেই জীবন নির্বাহ করতে গিয়ে খরচ হয়ে গেছে, ফলে এখন তাঁরা এত লক্ষ লক্ষ টাকা কোথা থেকে পাবেন?
রাজ্য আদালতের কাছে ভারতীয় সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ (ন্যায়বিচার দেওয়ার) ক্ষমতা ব্যবহার করে এই শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের মুক্ত করার আর্জি জানাবে।
মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং রাজ্যের এই সম্ভাব্য আইনি যুক্তিকে ওয়াকিবহাল মহল সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে করছে।

যদিও বিকাশ ভবনের কিছু আধিকারিক আশঙ্কা করছেন যে, ‘অযোগ্য’দের বেতন ফেরতের বিষয়টি এভাবে পিটিশনের মধ্যে রাখা হলে গোটা রিভিউ প্রক্রিয়াটিই বাতিল হয়ে যেতে পারে। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি ‘টেন্টেড’ বা ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিতদের (র‍্যাঙ্ক জাম্প ও ওএমআর মিসম্যাচ সংক্রান্ত) একাধিক আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এই আধিকারিকরা তাদের যুক্তি রাজ্য সরকারের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, যাতে শুনানির সময় সরকার ‘অযোগ্য’দের নিয়ে তাদের অবস্থান পরিমার্জন করে। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের আন্দোলনের নেতা বৃন্দাবন ঘোষের অভিযোগ, “এই সরকার প্রথম থেকেই যোগ্য–অযোগ্য গুলিয়ে দিতে চেয়েছে। সেই কারণে এমন রিভিউ পিটিশনের পাশাপাশি যোগ্যদের রাস্তায় বসিয়ে অযোগ্যদের চাকরিও সরকার নিশ্চিত করতে চাইছে।” তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “এই ভাবে পিটিশনে গেলে তা আদৌ সুপ্রিম কোর্টে গ্রহণযোগ্য হবে কি না।”

তথাকথিত ‘টেন্টেড’ বা ‘অযোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরাও বলছেন যে, পাঁচ বছরের বেতন ফেরত দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের নেই। তাঁদের দাবি, বেতনের বেশিরভাগই খরচ হয়ে গেছে এবং টাকা ফেরতের নির্দেশ শুধু অন্যায্য নয়, অমানবিকও।

আইনজীবী ও রাজ্যের প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল জয়ন্ত মিত্র মনে করেন, রাজ্য সরকারের এই সওয়ালের পেছনে মানবিকতার যুক্তি থাকতে পারে। তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “অযোগ্যদের ঢাল করে রাজ্য আসলে সেই দুর্নীতিগ্রস্তদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে না তো, যারা এই অযোগ্যদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য টাকা তুলেছিল?” সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় এ ধরনের যুক্তির সমালোচনা করে বলেছেন, “একজন চোর যদি গিয়ে বলে আমার চুরি করতে অনেক শ্রম লেগেছে, তা বলে কি তাকে রেহাই করে দেওয়া যায়? এই যুক্তি আইনত এবং নীতিগত ভাবেও ঠিক নয়।”

রিভিউ পিটিশনের একটি বড় অংশ জুড়ে অবশ্য ‘যোগ্য’দের চাকরি ফেরতের প্রসঙ্গও থাকছে। রাজ্য আদালতে যুক্তি দিতে পারে যে, এসএসসির ‘তথাকথিত’ অনিয়মের জন্য কেন এত নির্দোষ মানুষকে এই সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। স্কুলের পরিকাঠামো ভেঙে পড়ার যুক্তিও তোলা হবে। এক্ষেত্রে রাজ্যের হাতিয়ার নিট কেলেঙ্কারি, যেখানে দুর্নীতি ধরা পড়ার পরেও সুপ্রিম কোর্ট পুরো পরীক্ষা বাতিল করেনি, বরং ছাত্রদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে। রাজ্য প্রশ্ন তুলবে যে, এত শিক্ষকের চাকরি চলে গেলে বাংলার ৭৮ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ এবং পড়াশোনা কী ভাবে চলবে।

সুপ্রিম রায়ে ‘টেন্টেড’ বা ‘অযোগ্যে’র সংখ্যা ৬,২৭৬ জন বলা হলেও, রাজ্যের দাবি সংখ্যাটা আরও কম – ৫,৩০৩ জনের বেশি নয়।

এদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা নতুন নিয়োগ পরীক্ষায় বসলে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে বাড়তি নম্বর দেওয়া হতে পারে। যদিও আইনজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বড় আইনি সমস্যা তৈরি করতে পারে, কারণ সুপ্রিম কোর্ট আগেই জানিয়েছিল যে ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না।

‘বঞ্চিত’ চাকরিপ্রার্থীদের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য অবশ্য দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন যে, কোনো রিভিউ পিটিশনই ধোপে টিকবে না, কারণ রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা জানিয়েছে।