‘মা, আমি চুরি করিনি!’ চিপস চুরির অপবাদে, অপমান সহ্য না পাড়ায়, চরম পদক্ষেপ কিশোরের

সামান্য চিপস চুরির মিথ্যা অপবাদ! আর তার জন্য এক কিশোরকে এমন হেনস্থা করা হলো যে, সে বাধ্য হলো চরম পদক্ষেপ নিতে। মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়ার গোঁসাইবেড় বাজার এলাকায়। যেখানে তাবড় তাবড় নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে চাকরি থেকে গরু ও কয়লা চুরির অভিযোগ, সেখানেই চুরির অপবাদে কান ধরে ওঠবস করানোর পাশাপাশি সপ্তম শ্রেণির সেই ছাত্রকে মারধরও করা হয় বলে অভিযোগ। ছোট হলেও বিনা দোষে এমন অপমান মেনে নিতে পারেনি ফুটফুটে প্রাণ। নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার আগে মাকে শেষ চিঠিতে সে লিখে গেল নিজের জবানবন্দি। ওই চিঠিতে লেখা, “মা, আমি চুরি করিনি।”

কী ঘটেছিল সেদিন?
মৃত সপ্তম শ্রেণির ছাত্রের নাম কৃষ্ণেন্দু দাস। চিপস চুরির অপবাদে তাকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগ উঠেছে দোকানের মালিক ওরফে পেশায় সিভিক ভলান্টিয়ার শুভঙ্কর দীক্ষিতের বিরুদ্ধে। ছেলেকে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জগন্নাথ দাস বলেন, “আমার ছেলেকে সামান্য চিপস চুরির অপবাদ দিয়েছিল। সেই অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আমার ছেলেটা চলে গেল।”

তাঁর কথায়, “আমার ছেলে চিপস কেনার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। ও দোকানে গিয়ে দেখে ব্যবসায়ী নেই। তখন দু’বার তাঁকে ডাকে। কিন্তু না পেয়ে ফিরে চলে আসছিল। সে সময় রাস্তায় একটি চিপসের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখে। ও প্যাকেটটা তুলে চলে আসছিল। তখন দোকানদার ছেলেকে দেখে বাইক নিয়ে ধাওয়া করে ওকে ধরে ফেলে। ছেলেকে বলে, ‘তুই চিপসটা দোকান থেকে চুরি করে আনলি!’ আমার ছেলে বলে, ‘না স্যার আমি কুড়িয়ে পেয়েছি।’ আমার ছেলে দোকানদারকে চিপসের টাকাও দিয়ে দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই দোকানদার আমার ছেলেকে ধরে দোকানে নিয়ে যায় এবং তাকে জোর করে স্বীকার করতে বলে যে সে চুরি করেছে। ছেলেকে কানধরে ওঠবসও করায়।”

মর্মান্তিক পরিণতি ও শেষ চিঠি
স্থানীয় সূত্রে খবর, ঘটনা প্রাথমিকভাবে শুনে কৃষ্ণেন্দুর মা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে শাসন করে এবং বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এই চোর অপবাদ সহ্য করতে না পেরে চাষের জন্য বাড়িতে থাকা কীটনাশক খায় নাবালক। তাকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি তমলুক মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হলেও শেষরক্ষা হয়নি। বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যু হয় কৃষ্ণেন্দুর। নিজেকে শেষ করার আগে চিঠির মাধ্যমে মায়ের কাছে নিজের সততা প্রমাণ করার চেষ্টা করে সে। চিঠিতে কৃষ্ণেন্দু লিখে গিয়েছে, “মা, আমি বলে যাচ্ছি যে, আমি কুড়কুড়েটি রাস্তার ধারে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। চুরি করিনি।”

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও পুলিশের ভূমিকা
ঘটনা জানতে পেরে ইতিমধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার। শোকের ছায়া নেমে আসে এলাকায়। দোষীর কড়া শাস্তির দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী। মৃতের প্রতিবেশী সুবোধ দাস বলেন, “একটা চিপসের প্যাকেটের জন্য বাজারের উপর বাচ্চাটাকে মানসিক অত্যাচার করা হয়। তারপর বাচ্চাটা বাড়ি গিয়ে নিজের জীবন শেষ করে দেয়।”

ঘটনা নিয়ে পাঁশকুড়া থানার এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “মৃতের পরিবারের কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগ করা হয়নি। তাই আমরা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করছি।”

যদিও যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই শুভঙ্কর দীক্ষিতের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এমনকি দোকানে থাকা সিসিটিভির ফুটেজও কোনো রকমভাবে দেখাতে রাজি হননি তিনি। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন যে, সিভিকদের এত বাড়-বাড়ন্ত কেন? কীভাবে আইনের রক্ষক হয়ে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিলেন শুভঙ্কর?

এই ঘটনা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সংবেদনশীলতার অভাব কতটা তুলে ধরে বলে আপনি মনে করেন?