“৩ বছরের শিশুর ধর্ষণ ও হত্যায় বেকসুর খালাস!”-সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অবাক সকলে

একটি তিন বছরের শিশুকন্যাকে ভয়াবহ ভাবে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় নিম্ন আদালত ও বম্বে হাইকোর্টে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে সসম্মানে মুক্তি দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। ‘তদন্তে ফাঁক রয়েছে’ এবং পুলিশ প্রমাণ সাজিয়েছে—এই যুক্তিতে গত শুক্রবার দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ঘিরে নিহত শিশুর পরিবার থেকে শুরু করে আইনজ্ঞ মহল এবং সমাজ— সর্বত্রই নানা প্রশ্ন ও শোরগোল সৃষ্টি হয়েছে। শীর্ষ আদালতের এই রায় তাদের নিজেদেরই পূর্বতন একাধিক নির্দেশের পরিপন্থী কিনা, তা নিয়েও জোরদার বিতর্ক শুরু হয়েছে।

নৃশংস ঘটনা এবং তদন্তের মোড়

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। মহারাষ্ট্রে তিন বছরের ওই শিশু তাদের বাড়ির উঠোনে পোষ্য কুকুরের সঙ্গে খেলছিল যখন তার বাবা-মা অল্প সময়ের জন্য বাইরে ছিলেন। ফিরে এসে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। দু’দিন বাদে কাছাকাছির একটি পুকুর থেকে তার প্রায় পচে যাওয়া নগ্ন দেহ উদ্ধার হয়। মেডিক্যাল টেস্টে নিশ্চিত হয় যে শিশুটিকে ভয়াবহ ভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং তার যৌনাঙ্গে অজস্র আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ পেশায় গার্ড রামকিরাত মুনিলাল গৌড়কে গ্রেপ্তার করে। ফরেন্সিক রিপোর্টে নির্দিষ্ট কিছু বোঝা না গেলেও মেয়েটির দেহ যেখান থেকে উদ্ধার হয়েছিল সেখানকার মাটির নমুনা অভিযুক্তের জুতোর তলার মাটির নমুনার সঙ্গে মিলে যায়। ওই গার্ডের পরনের লুঙ্গি ও আন্ডারওয়ারেও মেলে কিছু প্রমাণ। এই সমস্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিম্ন আদালত এবং বম্বে হাইকোর্ট রামকিরাত গৌড়কে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাণদণ্ড দেয়। এরপরই সে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়।

সুপ্রিম কোর্টের যুক্তি এবং মুক্তি

সুপ্রিম কোর্টে রামকিরাতের আইনজীবী দাবি করেন, তদন্তে কিছুই সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ হয়নি এবং পুলিশ তার মক্কেলকে ফাঁসানোর জন্য প্রমাণ সাজিয়েছে। দু’পক্ষের যুক্তি শুনে সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ তাদের রায়ে বলে, এই মামলা শুধুমাত্র পারিপার্শ্বিক প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে এবং ‘লাস্ট সিন’ ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করছে। আদালত মনে করে, সরকারপক্ষ কখনওই প্রমাণ করতে পারেনি যে রামকিরাত গৌড়ই অপরাধী। যেন তাকে অপরাধী প্রমাণ করবার জন্য কেসের বিভিন্ন অংশ জোর করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রামকিরাত গৌড়কে সসম্মানে মুক্তি দেয়।

পরিবার ও সমাজের প্রশ্ন

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর স্বাভাবিকভাবেই নিহত শিশুর পরিবার শোকে পাথর। সব প্রমাণ দেওয়ার পরেও আদালত এ কী করল! তাদের প্রশ্ন, তা হলে তাদের শিশুকন্যার এই ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নের কোনও জবাব তাদের কাছে নেই।

আইনজ্ঞ মহল এবং শিশু অধিকার কর্মীরা সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন। বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন শিশু অধিকার কর্মীর প্রশ্ন, পকসো আইনে অপরাধীকে নিজেকে বেকসুর প্রমাণ করতে হয় এবং ধরেই নেওয়া হয় সে অপরাধ করেছে। এই ক্ষেত্রে কেন প্রসিকিউশনের কোনও প্রমাণই মান্যতা পেল না? সুপ্রিম কোর্টেরই এক আইনজীবী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আর এক ব্যক্তির কথায়, আমরা আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে পারছি না এটা তো লজ্জার, তার চেয়েও বড় লজ্জা তাকে ন্যায়বিচারও দিতে পারছি না। তিনি বলেন, আমাদের দেশের শিশুদের সঙ্গে ঘৃণ্য অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, এই বার্তা যাচ্ছে বিভিন্ন কোর্ট থেকে। মাস কয়েক আগেও ২৩ বছরের একটি মেয়ের ধর্ষণ-খুনে একই ভাবে শীর্ষ কোর্ট অপরাধীকে মুক্তি দিয়েছিল।

সুপ্রিম কোর্ট কি নিজেই নিজের রায় মানছে না?

আইনজ্ঞ মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সুপ্রিম কোর্টের নিজেদেরই পূর্বতন একাধিক রায়কে ঘিরে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের দু’জন শীর্ষ আধিকারিকদের মতে, সুপ্রিম কোর্ট নিজেই নিজের নির্দেশ মানছে না। তারা একাধিক মামলার (১৯৯৯-এর কর্নাটক বনাম কে ইয়ারাপ্পা রেড্ডি, ২০১২-র দয়াল সিং বনাম উত্তরাঞ্চল, ২০১৩-র হেমা বনাম তা মাদ্রাজ ও ২০২৫-এর এড়াক্কানডি দীনেশ বনাম কেরালা সহ) উল্লেখ করে জানান, প্রতি ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্ট বলেছে যে যদি তদন্তে গাফিলতি থাকে বা ফাঁক থাকে, তা হলে সেই অপরাধ মিথ্যা হয়ে যায় না এবং অভিযুক্ত বা অপরাধীও সব সময়ে বিশেষ কোনও সুবিধা পেতে পারে না। তদন্তে ফাঁক থাকলেও বাকি তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখতে হবে যাতে কোনও ভাবেই ক্রিমিন্যাল জাস্টিস ব্যাহত না হয়। অতি সম্প্রতিও সুপ্রিম কোর্ট এই নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

একজন জয়েন্ট সিপি র‍্যাঙ্কের অফিসারের সাফ কথা, তদন্তে সব কিছু সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করা যায়নি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে—যদি এ কথা মেনেও নিই—তা হলে বাকি তথ্যপ্রমাণ দেখে শাস্তি কমানো যেত না? নির্দোষ কী ভাবে হলো সে? তার মতে, ‘লাস্ট সিন’ আর ‘পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ’-এর জন্যও নির্দিষ্ট গাইডাইন্স রয়েছে, এবং রায় পড়ে তার মনে হয়েছে সেখানে খুব একটা ফাঁক নেই, তা হলে সেগুলো কেন এ ক্ষেত্রে মান্যতা পেল না? তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের রায়ে পুলিশের মনোবলেও চিড় ধরাবে।

সাম্প্রতিক অতীতে একাধিক এমন রায় দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সুপ্রিম কোর্ট তদন্তে ফাঁক নিয়ে নিজের নির্দেশই সব সময়ে মানছে না—এই মর্মে কোনও জনস্বার্থ মামলা করা সম্ভব কি না? এই বিষয়ে আইনজ্ঞদের বড় অংশের মত, তা করায় অসুবিধা নেই, তবে কিছু জটিলতাও আছে।

সব মিলিয়ে, একটি শিশু ধর্ষণ ও খুনের মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায় শুধু নিহত শিশুর পরিবারের মনেই নয়, আইনজ্ঞ মহল এবং সমাজেও গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ন্যায়বিচার প্রদানের প্রক্রিয়ায় তদন্তে গাফিলতির কারণে অপরাধীর মুক্তি কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে জোরদার বিতর্ক শুরু হয়েছে।