বিশেষ: সাধারণ ইউটিউবার থেকে কীভাবে পাকিস্তানি গুপ্তচর, জেনেনিন ‘মক্ষিরানি’ জ্যোতির কাহিনী?

হরিয়ানার হিসারের জনপ্রিয় ভ্রমণ ইউটিউবার জ্যোতি মালহোত্রা এখন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক অত্যন্ত গুরুতর মামলার কেন্দ্রে রয়েছেন। ‘ট্র্যাভেল উইথ জো’ (Travel with Joe) নামে পরিচিত তার ইউটিউব চ্যানেল, যার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৩.৭ লক্ষেরও বেশি, সেই জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের আড়ালে তিনি নাকি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংবেদনশীল তথ্য পাচার করছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার হিসার পুলিশ জ্যোতি মালহোত্রাকে গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে ভারতের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ধারা ৩, ৪, ৫ এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৫২ ধারায় গুরুতর মামলা রুজু করা হয়েছে। বর্তমানে সে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্ত করছে অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা (Economic Offences Wing বা EOW)।
তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, ভ্রমণ ভিডিও এবং বিদেশ সফরের ডকুমেন্টারি বানিয়ে লাখো দর্শকের মন জয় করা মালহোত্রার ইউটিউব চ্যানেলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গোপন অধ্যায়। অভিযোগ উঠেছে যে, ২০২৩ সালে তার পাকিস্তান সফরের সময় নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মী এহসান-উর-রহিম ওরফে দানিশের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে যে দানিশ পরবর্তীতে জ্যোতির হ্যান্ডলার অর্থাৎ নির্দেশদাতা হয়ে ওঠেন এবং তার মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তি চালাতেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জ্যোতি এনক্রিপ্টেড বা সংকেতবদ্ধ চ্যানেলের মাধ্যমে দানিশ ও অন্যান্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা অফিসারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। এদের মধ্যে আলী এহওয়ান, শাকির এবং রানা শাহবাজ নামের ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যাদের সঙ্গে জ্যোতির পাকিস্তানে গোপন বৈঠক হয়েছে বলেও তদন্তকারীদের দাবি।
অভিযোগ আরও গুরুতর। মালহোত্রা নিজের মোবাইল ফোনে পাকিস্তানি সংযোগগুলোর নাম ভিন্নভাবে সংরক্ষণ করত — যেমন ‘জট রানধাওয়া’ বা অন্য কোনো সাংকেতিক নাম ব্যবহার করত— যাতে করে গোয়েন্দাদের নজরদারি বা শনাক্তকরণ এড়ানো যায়। এমনকি পুলিশ ও তদন্তকারীদের কাছে তথ্য রয়েছে যে, তিনি বালিতে এক পাকিস্তানি সংযোগের সঙ্গে ভ্রমণও করেছিলেন। এই সমস্ত কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে একটি সুপরিকল্পিত গুপ্তচর নেটওয়ার্কের দিকে ইঙ্গিত করে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, জ্যোতি মালহোত্রা কেবল একজন ব্যক্তি হিসেবে কাজ করছিল না — সে একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ মনোভাব তুলে ধরার জন্য এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল তথ্য পাচারের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলকে একটি কভার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তার ভিডিওগুলি একধরনের প্রচার কার্যক্রম (propaganda) হিসেবেও দেখা হচ্ছে। হিসার পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলায় ইতিমধ্যেই আরও ছজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা এই নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি প্রমাণ করে।
এই চাঞ্চল্যকর মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আরেক জনপ্রিয় ভ্রমণ ইউটিউবার ‘ইয়াত্রি ডাক্তার’ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপোস নেই এবং তিনি তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এই ঘটনা ভ্রমণ ব্লগিং জগতে এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং দেশের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা জ্যোতি মালহোত্রাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই নেটওয়ার্কের আরও তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।