‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনই গুলিবর্ষণ পাক সেনার মৃত্যু ৩ ভারতীয়ের! ‘যে কোনও হামলার বদলা নেবে মোদী’: দাবি শাহের্

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ নিরীহ পর্যটকদের উপর নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার কড়া জবাব দিল ভারত। ওই ঘটনার পরই দেশজুড়ে ওঠা ‘বদলা’র দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার গভীর রাতে পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি আস্তানায় এক বড়সড় অভিযান চালায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত এই অভিযানে ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অন্তত ৫০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই অভিযান চলাকালীনই নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পাকিস্তানি সেনার পাল্টা গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে।

পহেলগাঁও হামলা ছিল মুম্বইয়ের পর সবচেয়ে বড়: বিদেশসচিব

গত এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে একদল দুষ্কৃতী নিরীহ পর্যটকদের উপর হামলা চালালে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন মহল থেকে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার দাবি ওঠে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, এই হামলার অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না। বিদেশসচিব বিক্রম মিসরি এই ঘটনাকে মুম্বই হামলার পর ভারতের মাটিতে ঘটা অন্যতম বড় জঙ্গি হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেন, “মুম্বই হামলার পর পহেলগাঁওয়ের ঘটনা সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা। পরিবারের সামনে পুরুষদের মাথায় গুলি করে মারা হয়েছে। কাশ্মীরের উন্নয়নের উপরেই হামলা।” তিনি আরও জানান যে, এই হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠন টিআরএফ (The Resistance Front), তবে এরা মূলত জইশ-ই-মহম্মদ এবং লশকর-ই-তৈবার মতো বড় সংগঠনগুলির হয়ে ছোট ছোট গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ করে চলেছে।

সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের মদত স্পষ্ট

ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদকে মদত দিয়ে চলেছে এবং এই ধরনের ছোট ছোট জঙ্গি সংগঠনগুলিকে আশ্রয় ও পরিকাঠামো দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। পহেলগাঁও হামলার পিছনেও পাকিস্তানের মদত স্পষ্ট।

গভীর রাতে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে নিখুঁত হামলা

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কড়া বার্তার পরই শুরু হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রস্তুতি। বুধবার গভীর রাতে, যখন অধিকাংশ দেশবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে সুনির্দিষ্ট নিশানায় আঘাত হানে। জানা গেছে, এই অভিযানে অত্যাধুনিক সরঞ্জামের সাহায্যে একের পর এক মিসাইল হামলায় ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই হামলা শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদী অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। পাকিস্তানের কোনও সাধারণ নাগরিক, সামরিক কেন্দ্র অথবা অর্থনৈতিক কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়নি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এই অভিযান চলাকালীনই সমাজমাধ্যমে ‘ভারত মাতার জয়’ লিখে সেনার প্রতি সমর্থন জানান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতিতেও এই অভিযান এবং তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে।

পাকিস্তানও হামলা স্বীকার করেছে, দিয়েছে তাদের দাবি

এদিকে, ভারতীয় সেনার এই হামলা স্বীকার করে নিয়েছে পাকিস্তানও। পাকিস্তান সেনার পক্ষ থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে জানানো হয়েছে যে, ভারতের পক্ষ থেকে সেদেশের ৬টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে এবং মোট ২৪টি হামলা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় পাকিস্তানের ৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন, ৩৫ জন আহত হয়েছেন এবং দু’জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

অপারেশন চলাকালীনই পাক সেনার গুলিবর্ষণে প্রাণ গেল ৩ ভারতীয়ের

তবে ভারতীয় সেনার ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। বিশেষ করে পুঞ্চ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ব্যাপক গোলাগুলি চলে। এই পাক সেনার গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া পুঞ্চ অঞ্চলে একজন মহিলা ও তাঁর মেয়ে আহত হয়েছেন বলেও খবর। ভারতীয় সেনার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, গতকাল রাতে ও আজ ভোররাতে পাকিস্তান এই গুলিবর্ষণ করে এবং এই সময়েই ৩ জন ভারতীয়ের মৃত্যু হয়। ভারতীয় সেনা পাল্টা যোগ্য জবাব দিয়েছে।

৫০০ জঙ্গি নিহত: ভারতের দাবি

সামগ্রিকভাবে, ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানে ভারতীয় সেনা সফলভাবে একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এবং অন্তত ৫০ জন জঙ্গিকে নিধন করেছে। ভারত সরকার সন্ত্রাসবাদকে সমূলে বিনাশ করতে বদ্ধপরিকর।

রাজনৈতিক মহলের প্রশংসা ও প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি

ভারতীয় সেনার এই অভিযানের প্রশংসা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘ভারতীয় সেনা নিরীহ ভাইদের মৃত্যুর বদলা নিল। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর উপর গর্বিত। ভারতের ওপর যে কোনও হামলার যোগ্য জবাব দেবে মোদী সরকার’। জানা গেছে, গতকাল রাতভর জেগে এই অভিযানের দিকে নজর রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরও একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভারতীয় সেনাকে সাধুবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

পহেলগাঁও হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়ে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। একদিকে যেমন এই অভিযান জঙ্গি পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি করেছে, তেমনই অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনার কাপুরুষোচিত গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু ঘটনার অন্য একটি দুঃখজনক দিক। এই ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।