ইউক্রেনের খনিজ সম্পদে ভাগ পাবে আমেরিকা, দুই দেশের চুক্তি সই

দীর্ঘ আলোচনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের মূল্যবান খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবে, তেমনই অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পুনর্গঠনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করা হবে। গতকাল, বুধবার (৩০ এপ্রিল) ওয়াশিংটনে দুই দেশের মধ্যে এই বহুল আলোচিত সমঝোতা চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়।

মাত্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউজে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে এক বৈঠকের পর প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েন দুই নেতা, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মেরামতের ক্ষেত্রে এই চুক্তিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চুক্তি স্বাক্ষর প্রসঙ্গে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন পুনর্গঠন বিনিয়োগ তহবিল গঠনের মাধ্যমে রাশিয়াকে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির পক্ষে দৃঢ়ভাবে পাশে আছে। তিনি আরও বলেন, এই অংশীদারত্বের ধারণাটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মস্তিষ্কপ্রসূত, যা দুই দেশের জনগণের শান্তি ও অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি বহন করে।

ইউক্রেনের অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অথবা সামরিক সহায়তার মাধ্যমে অর্থ প্রদান করবে। অন্যদিকে, ইউক্রেন তাদের খনিজ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৫০ শতাংশ এই তহবিলে জমা দেবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০ বছর এই তহবিল থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ শুধুমাত্র ইউক্রেনের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ করা হবে। এরপর থেকে তহবিলের লাভ অংশীদারদের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন) মধ্যে ভাগ হবে। তহবিল পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন উভয় পক্ষেরই সমান সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে। তবে এই চুক্তির আওতায় শুধুমাত্র ভবিষ্যতের সামরিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রী ইউলিয়া স্ভিরিদেঙ্কো এই চুক্তিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এই চুক্তির মাধ্যমে আমরা শুধু বিনিয়োগই লাভ করিনি, বরং একটি কৌশলগত অংশীদারও পেয়েছি।”

চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ডেনিস শ্মিহাল জানান যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরও ইউক্রেন তাদের ভূগর্ভস্থ সম্পদ, পরিকাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। একইসঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেন যে এই চুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়।

তবে, এই চুক্তিতে ইউক্রেনের প্রত্যাশিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সংক্রান্ত কোনো বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ইউক্রেনে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে রাশিয়ার আগ্রাসন প্রতিরোধ করা আরও সহজ হবে।

প্রসঙ্গত, ইউক্রেন দাবি করে থাকে যে তাদের ভূগর্ভে বিশ্বের প্রায় পাঁচ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ মজুত রয়েছে। এই খনিজগুলি ইলেকট্রনিক পণ্য, বৈদ্যুতিক যানবাহন নির্মাণ এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক নির্ধারিত ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মধ্যে ২২টির বিপুল মজুত ইউক্রেনে রয়েছে। নতুন এই চুক্তির ফলে এই খনিজ সম্পদ আহরণে গতি আসবে এবং দুই দেশই লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।