স্পেনে কোভিড-পরবর্তী ‘ভয়ের ঘর’, তিন শিশুকে বন্দি করে রেখেছিল জার্মান দম্পতি

স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ওভিয়েদো থেকে সামনে এসেছে এক অত্যন্ত মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। প্রায় আড়াই বছর ধরে, কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব শুরুর ঠিক পর থেকে, একটি জার্মান দম্পতি তাদের তিন নাবালক সন্তানকে বাড়ির ভেতরে আটকে রেখেছিলেন। পুলিশ বাড়িটিকে ‘ভয়ের ঘর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। আবর্জনায় ভরা সেই বাড়ি থেকে শিশুদের উদ্ধার করে তাদের বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দীর্ঘ গৃহবন্দী জীবন ও করুণ পরিস্থিতি:
স্প্যানিশ সংবাদপত্র লা নুয়েভা এস্পানার প্রতিবেদন এবং পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দম্পতির ৮ বছর বয়সী দুই যমজ ছেলে এবং ১০ বছর বয়সী আরেকটি ছেলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে আর একবারও বাড়ির বাইরে বের হয়নি। স্প্যানিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, উদ্ধার করার সময় বাড়িটির ভিতরের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়, যেন সেটি “পুরোপুরি আবর্জনায় ভরা”। এমনকি পুলিশ প্রধান ফ্রান্সিসকো হাভিয়ের লোজানো এই বাড়িটিকে ‘ভয়ের ঘর’ বলে বর্ণনা করেছেন।
শিশুদের আরও করুণ অবস্থা ছিল। তাদের বাড়ির বাগানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না এবং ঘরের ভেতরে তারা ‘খাঁচাবদ্ধ বিছানা’য় ঘুমাতো। বাইরের জগতের সাথে তাদের কার্যত কোনো রকম যোগাযোগ ছিল না। স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাচ্চাদের ডায়াপার এবং মুখোশ পরতে বাধ্য করা হতো, এবং বাড়িতে প্রচুর পরিমাণে ওষুধও পাওয়া গেছে। শিশুদের এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা বোঝাতে গিয়ে এক স্প্যানিশ কর্মকর্তা লা নুয়েভা এস্পানাকে বলেছেন, যখন তাদের বের করে আনা হয়, তখন তিনজনই এমনভাবে গভীর নিঃশ্বাস নিতে শুরু করে যেন তারা এর আগে কখনো তাজা বাতাস নেয়নি।
কীভাবে সামনে এল ঘটনা?
এই অমানবিক ঘটনাটি সামনে আসে একজন প্রতিবেশীর সতর্কতার কারণে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, এই শিশুরা কখনোই স্কুলে যায় না। তার সন্দেহ হওয়ায় তিনি পুলিশকে খবর দেন। প্রাথমিক সতর্কতা হয়তো খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি, কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের তৎপরতায় এই ভয়ঙ্কর সত্য উদঘাটন হয়।
অভিযুক্ত দম্পতি এবং অজানা কারণ:
পুলিশ শিশুদের বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করে এবং শিশুদের একটি কেয়ার হোমে রাখার ব্যবস্থা করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত বাবা ছিলেন ৫৩ বছর বয়সী একজন জার্মান পুরুষ এবং মা ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী এক নারী যার জার্মান এবং আমেরিকান দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে তারা শহরের উপকণ্ঠে একটি একক পরিবারের বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন। স্প্যানিশ পুলিশ যখন বাড়িটি পরিদর্শনে যায়, তখন শিশুদের বাবা-মা পুলিশ কর্মকর্তাদের মুখে মাস্ক পরার দাবি জানিয়েছিল বলেও জানা যায়।
এই দম্পতি কেন তাদের সন্তানদের দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন, সেই কারণ এখনও স্প্যানিশ কর্মকর্তারা প্রকাশ করেননি। জার্মানিতে তারা কোথায় থাকতেন বা তাদের এমন আচরণের নেপথ্যে কী ছিল, তা এখনও রহস্যাবৃত। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে শিশু সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।