“যাদের আমি নেতা করেছি, তাদের বেশি পেটব্যথা হচ্ছে”-ফের কড়া ভাষায় জবাব দিলীপের

দিলীপ ঘোষ দাবি করেছেন যে তার শরীর কাটলে বিজেপির রক্ত বইবে। একই সঙ্গে নাম না করে তীব্র আক্রমণ করেছেন শুভেন্দু অধিকারী ও সৌমিত্র খাঁকে। বুধবার দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনে সস্ত্রীক তার উপস্থিতি নিয়ে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে দিঘায় স্ত্রীকে পাশে নিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে তিনি রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেন এবং রাজ্যে দলের লাগাতার পরাজয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

‘যাদের আমি নেতা করেছি, তাদের বেশি পেটব্যথা হচ্ছে’

রাজ্য বিজেপিকে আক্রমণ করে দিলীপ এদিন বলেন, “মন্দির যিনিই তৈরি করুন না কেন, ভগবান সবার। কালীঘাটের মন্দির বা রামমন্দির কে তৈরি করেছে, তা মানুষ ভুলে যাবে, তবে ভগবানকে কেউ ভুলবে না। পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুতেই রাজনীতি হয়। আমার দলের কিছু লোক খুব কষ্ট পেয়েছেন এবং হতাশায় ভুগছেন, কেউ কেউ আত্মহত্যার কথাও ভাবছেন দেখে আমার মজা লাগছে। চোখের জল ফেলবেন না। আমরা রক্ত-ঘাম দিয়ে পার্টি দাঁড় করিয়েছি। বিজেপি কর্মীরা পিছন ফিরে তাকায় না… যতদিন দলে সন্দেহ বা বিরোধ ছিল না, দল এগিয়েছিল। যখন থেকে এই ‘অপসংস্কৃতি’ ঢুকেছে, তখন থেকে পার্টি পিছোচ্ছে। দিলীপ ঘোষ ১০ বছর ধরে রাজনীতি করছে। আমার দিকে আঙুল তোলার মতো সাহস কারও নেই… যাদের আমি নিয়ে এসে নেতা করেছি, এবং যারা বিজেপিতে থেকে সুবিধা লুটছে, তাদেরই বেশি পেটব্যথা হচ্ছে। তারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। দলের ওপর ভরসা রাখুন, চিন্তা করার দরকার নেই।”

দিলীপ ঘোষ কি দল ছাড়বেন? নিজেই জানালেন

দল ছাড়ার জল্পনা প্রসঙ্গে দিলীপ বলেন, “দিলীপ ঘোষ দল ছাড়বে কিনা বা কোথায় যাবে, তা নিয়ে অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা আনন্দিত। দিলীপ ঘোষ প্রয়োজনে রাজনীতি ছাড়বে, তবে বিজেপি ছাড়বে না। কিছু লোক মনে করছে আমি চলে গেলে জায়গা খালি হবে। পশ্চিমবঙ্গে যতদিন না রাজনৈতিক পরিবর্তন হচ্ছে, ততদিন লড়াই চলবে। এটাই আমার মিশন। আমার লক্ষ লক্ষ সাথী যারা ১০ বছর ধরে লড়াই করেছেন, তারাই আমাদের প্রেরণা। আমার সময়ে ২৫৭ জন কর্মী প্রাণ দিয়েছেন। আমরা ৭৭টি আসন জিতেছিলাম, আজ এক ডজন বিধায়ক ছেড়ে চলে গেছে। সাংসদ, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদও চলে যাচ্ছে। ঘাবড়াবেন না, ভয় পাবেন না। আমাদের বিচারধারা ঠিক আছে। বিজেপি ভয় পায় না বলেই ভারতবর্ষের পরিবর্তন করতে পেরেছে।”

‘অটল বিহারী বাজপেয়ী মমতা ব্যানার্জির মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন’

তিনি বলেন, “আমরা সেই পার্টির সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, যে দলের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী কালীঘাটে গিয়ে মমতা ব্যানার্জির মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন। আমরা সেই সংস্কৃতির লোক। উনি তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আজ অন্যদিকে গিয়ে শত্রু হয়ে গেছেন, তা আমি মনে করি না। আমি রাজনীতিতে কাউকে শত্রু বানাই না, মিত্র বানাই। তাই দল এত বড় হয়েছিল। আজ অনেকে এসে নেতৃত্ব করছেন।”

‘দিলীপ ঘোষকে কাটলে বিজেপির রক্ত বইবে’

দিলীপ বলেন, “অটল বিহারী বাজপেয়ী বাসে করে লাহোর গিয়েছিলেন… আমরা সেই সংস্কৃতির লোক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নওয়াজ শরীফের মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। এরপর পাঠানকোট, পুলওয়ামা হয়েছিল। মোদী সরকার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করতেও ভোলেননি। এটাই ভারতের সংস্কৃতি। আমরা যেন আমাদের পরিচিতি ভুলে না যাই। আমার পাড়ায় কোনো তৃণমূল নেতার বাড়িতে বিয়ে হলে সে তৃণমূল করে বলে আমি যাব না, এমন রাজনীতি দিলীপ ঘোষ করে না এবং করবেও না… যারা এটা করছে, তারা বিজেপি জানে না। তারা দিলীপ ঘোষকে চেনে না। এর পিছনে কী ত্যাগ আছে, তা জানে না। যারা ২০২০-২১ সালে বিজেপিতে এসেছে, তারা বিজেপি বোঝে না। দিলীপ ঘোষকে কেউ আরএসএস বা হিন্দুত্ব বোঝাবেন না। আমাকে কাটলে বিজেপির রক্ত বেরোবে। বাকিদের কী রক্ত আছে, জানি না। বহু জায়গায় তারা ঘুরে এসেছেন।”

‘মমতা ব্যানার্জির আঁচলের তলায় থেকে নেতা হয়েছেন…’

শুভেন্দু ও সৌমিত্রকে আক্রমণ করে দিলীপ বলেন, “বড় বড় কথা কারা বলছেন? যারা মমতা ব্যানার্জির আঁচলের তলায় থেকে নেতা হয়েছেন। যারা কালীঘাটের উচ্ছিষ্ট খেয়েছে, তারা দিলীপ ঘোষকে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিচ্ছে। যারা চারটে বিয়ে করে, ১৪টা গার্লফ্রেন্ড রাখে। যাদের দিনের ও রাতের জীবন আলাদা। তারাই দিলীপ ঘোষকে ত্যাগী বা ভোগী বলছে। মানুষ জানে দিলীপ ঘোষ কেমন। আমার মন আর মুখ এক। আমি পর্দার আড়ালে কথা বলি না, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলি। দিলীপ ঘোষ বাংলা পাল্টাতে এসেছেন। তিনি পাল্টাবেন না।”

‘এই দালালরা যখন থেকে পার্টিতে এসেছে, বিজেপির স্বাদ-গন্ধ চলে গেছে’

দিলীপ আরও বলেন, “দিলীপ ঘোষ আছে এবং থাকবে। এখন আবেগে ভেসে যাওয়ার সময় নয়। আজ যারা বড় বড় কথা বলছেন, তারা কী করেছেন? তাদের চার পয়সারও ত্যাগ নেই। তারা বিজেপিতে কামাতে এসেছেন। আমি দোকান সাজিয়ে এসেছিলাম ৭৭ জন বিধায়ক নিয়ে। এক ডজন বিধায়ক নেই কেন? সাংসদ কোথায় গেল?… ২০২১ সালের পর থেকে বিজেপি নামছে। ২০১৯ সালে বিজেপি ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ২০২১ সালের পর আমরা জিততে ভুলে গেছি। আমাকে রাজনীতি শেখাচ্ছেন? এই দালালরা যখন থেকে পার্টিতে এসেছে, বিজেপির স্বাদ-গন্ধ চলে গেছে। আমরা জিততে ভুলে গেছি।”

সকালের সাংবাদিক সম্মেলন শেষ হতেই স্থানীয় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা ‘দিলীপ ঘোষ জিন্দাবাদ, তৃণমূলে দিলীপ ঘোষকে স্বাগত’ বলে স্লোগান দেন। আগামী দিনে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।