“কিশোরীর বুকে হাত দেওয়া ধর্ষণের চেষ্টা নয়”-পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের

এক নাবালিকার বুকে আপত্তিকর ভাবে হাত দেওয়া বা ‘গ্রোপ’ করা মানেই ধর্ষণের চেষ্টা নয়, বরং এটিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ হিসেবে বিচার করা যেতে পারে— এমনই পর্যবেক্ষণ দিয়ে সাজাপ্রাপ্ত এক যুবককে অন্তর্বর্তী জামিনের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চ। ২০২৩ সালের একটি ঘটনায় কার্শিয়াং আদালত ওই অভিযুক্তকে পরের বছর ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। ওই যুবক গত দু’বছর চার মাস ধরে জেলে ছিলেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি

শুক্রবার বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। ডিভিশন বেঞ্চ তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, নির্যাতিতার বক্তব্য এবং অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখে স্পষ্ট যে, এটি ধর্ষণের চেষ্টা নয়। ডিভিশন বেঞ্চের মতে, ২০১২ সালের পকসো আইনের ১০ নম্বর ধারায় শ্লীলতাহানির অভিযোগে এর বিচার হতে পারে। নাবালিকা তার জবানবন্দিতে বলেছে যে, অভিযুক্ত মদ্যপ অবস্থায় তার বুকে আপত্তিকর ভাবে হাত দিয়েছিল। ওই মামলায় ডাক্তারদের রিপোর্ট এবং বয়ান দেখে আদালতের মনে হয়েছে, তাঁরা ঘটনার চেয়েও নাবালিকার ‘ফেস ভ্যালু’–কে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছেন।

সাজাপ্রাপ্ত যুবকটি কার্শিয়াং আদালতের ২০২৪ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল এবং হাইকোর্টের কাছে অন্তর্বর্তী জামিনের আবেদন জানিয়েছিল। শুক্রবার হাইকোর্ট জামিন দিতে গিয়ে জানিয়েছে, নিম্ন আদালতের সাজার রায় চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলার শুনানি করে কত দিনে বিচার হবে, সেটা অজানা। এই অবস্থায় হাইকোর্ট তাকে অন্তর্বর্তী জামিন দিচ্ছে। একই সঙ্গে নিম্ন আদালত ওই যুবককে যে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল, সেটাও হাইকোর্ট আপাতত রদ করেছে।

অতীতেও বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ ও সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান

উল্লেখ্য, নাবালিকা সংক্রান্ত যৌন নির্যাতন মামলায় অতীতে বিভিন্ন হাইকোর্টের একাধিক পর্যবেক্ষণ ও রায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং দেশের শীর্ষ আদালত সেগুলির সমালোচনা করেছে। এক নাবালিকার বুকে হাত দেওয়া, তার পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া মানেই ধর্ষণের চেষ্টা নয় বলে একটি মামলায় মাস খানেক আগে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলা গ্রহণ করে এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবস্থান খারিজ করে দেয়। আবার, এলাহাবাদের হাইকোর্টেরই অন্য এক জন বিচারপতি কিছু দিন আগে মন্তব্য করেন, ধর্ষিতা হওয়ার পরিস্থিতি এক তরুণী নিজেই তৈরি করেছেন। দেশের শীর্ষ আদালত সেই মন্তব্যেরও তুমুল সমালোচনা করে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেয়।

বছর দুয়েক আগে মহারাষ্ট্রের নাগপুর বেঞ্চের বিচারপতি পুষ্পা জ্ঞানেদিওয়ালা পকসো মামলায় একের পর এক বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ ও রায় দিয়ে গোটা দেশে সমালোচনার মুখে পড়েন। সম্প্রতি তিনি আগাম অবসর নিয়েছেন। তাঁর বিতর্কিত পর্যবেক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— জামার উপর দিয়ে নাবালিকার দেহ বা বুকে স্পর্শ করা ধর্ষণের চেষ্টা নয়, ‘স্কিন–টু–স্কিন টাচ’ না–হলে ধর্ষণ হয় না। অন্য একটি মামলায় ওই বিচারপতিরই পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘প্যান্টের চেন না–খুলে’ বা ‘শুধু নাবালিকার হাত ধরলেই’ ধর্ষণের চেষ্টা হয় না। বছর দুয়েক আগে কলকাতা হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ একটি পকসো মামলায় কিশোরীদের সেক্স থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে কী কী করণীয়, সে সম্পর্কে গুচ্ছ পরামর্শ দেয়। তারও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় শীর্ষ আদালতে।

এ ধরনের প্রায় সব ক’টি পর্যবেক্ষণেরই কঠোর সমালোচনা করেছে সুপ্রিম কোর্ট, এবং বিভিন্ন হাইকোর্টের এহেন বিতর্কিত রায় খারিজ করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতেই কার্শিয়াং কোর্টের ধর্ষণের মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেশের শীর্ষ আদালত কী প্রতিক্রিয়া দেয়, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে অভিজ্ঞ আইনজীবীদের একাংশের মধ্যে।