সেনাবাহিনীতে লক্ষাধিক পদ খালি, পহেলগাঁও হামলার আবহে বাড়ছে দিন কে দিন

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানকে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে সামনে এসেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক উদ্বেগজনক চিত্র। জানা গেছে, দেশের সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীতে বর্তমানে এক লক্ষেরও বেশি পদ শূন্য রয়েছে, এবং নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত হচ্ছে না। এই তথ্য আর কেউ নয়, স্বয়ং প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সংসদের স্থায়ী কমিটিকে দেওয়া তাদের সর্বশেষ রিপোর্টে জানিয়েছে।

সংসদের স্থায়ী কমিটিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর মোট কার্যকরী সংখ্যা বর্তমানে ১২.৪৮ লক্ষ। অথচ, অনুমোদিত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, যা ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত সেনাবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ১১,০৫,১১০ জন, যেখানে অনুমোদিত সংখ্যা ছিল ১১,৯৭,৫২০ জন। অর্থাৎ, জুনিয়র কমিশনড অফিসার (JCO) ও নন-কমিশনড অফিসার (NCO) স্তরে প্রায় ৯২,৪১০ জনের ঘাটতি রয়েছে, যা অনুমোদিত সংখ্যার ৭.৭২ শতাংশ।

অফিসার স্তরেও পরিস্থিতি গুরুতর। ২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেনাবাহিনীতে মোট অফিসারের সংখ্যা (চিকিৎসা, দাঁত এবং নার্সিং শাখা বাদে) ছিল ৪২,০৯৫ জন, যেখানে অনুমোদিত সংখ্যা হলো ৫০,৫৩৮ জন। অর্থাৎ, অফিসার ক্যাডারে প্রায় ১৬.৭১ শতাংশের ঘাটতি রয়েছে।

সেনাবাহিনী যখন এই কর্মীসংখ্যার ঘাটতির সম্মুখীন, ঠিক তখনই তাদের অপারেশনাল চাপ বেড়েছে। একদিকে যেমন চীন সীমান্তে পূর্ব লাদাখে ৫০,০০০-এর বেশি সেনা দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে, তেমনি জম্মু অঞ্চলে সন্ত্রাসী হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত ১৫,০০০ সেনা পাঠানো হয়েছে।

এই বিশাল ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রক মূলত ‘অগ্নিপথ’ নিয়োগ প্রকল্পের উপর নির্ভর করছে। ২০২২ সাল থেকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর ৪০,০০০ জন ‘অগ্নিবীর’ নিয়োগ করা হলেও, কোভিডের কারণে পূর্ববর্তী দুই বছর নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় প্রায় ১.২ লক্ষ সেনার স্বাভাবিক অবসর এবং অন্যান্য কারণে বাহিনী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতা এখনও পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

তবে, অফিসার ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে কমিটিকে জানিয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সার্ভিস সিলেকশন বোর্ড (SSB)-এর মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় নানা সংস্কার আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারভিউয়ের তারিখের বারবার বদল এড়ানো, অনুপস্থিত প্রার্থীদের দ্বিতীয় সুযোগ প্রদান, SSB ব্যাচের সংখ্যা দ্বিগুণ করা, অনলাইনে ডকুমেন্ট আপলোড করার সুবিধা চালু করা এবং মেডিকেল পরীক্ষার জন্য ৮-১০ দিনের দীর্ঘ সময় কমিয়ে তা ২-৩ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা।

তাছাড়াও, অফিসার প্রশিক্ষণে দ্রুততা আনতে চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে (OTA) একটি ‘ইয়ং লিডারস ট্রেনিং উইং’ চালু করা হয়েছে, যেখানে কর্মরত সৈন্যদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অফিসার পদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। ১০+২ টেকনিক্যাল এন্ট্রি স্কিম (TES)-এও সংস্কার এনে ৩+১ বছরের মডেল চালু করা হয়েছে, যাতে প্রশিক্ষণের সময় এক বছর কমে যায় এবং দ্রুততার সাথে আরও বেশি সংখ্যক অফিসার তৈরি হয়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক আশ্বাস দিয়েছে যে, নিয়মিত সময়সীমার মধ্যে অফিসার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু থাকবে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আনা সংস্কারের ফলে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, দেশের সামরিক প্রস্তুতি এবং বর্তমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সময়ে সেনাবাহিনীর এই বিশাল কর্মীসংখ্যার ঘাটতি দেশীয় প্রতিরক্ষার জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ না হলে তা অপারেশনাল সক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।