বাঘের হানায় মৃতদের পরিবারকে ১৪ বছর পর ক্ষতিপূরণের নির্দেশ হাইকোর্টের, আদালতের নির্দেশে বেঁচে গেল ৩ পরিবার !

সরকারি অনুমতিপত্র নিয়ে সুন্দরবনের নদী-খাঁড়িতে মাছ, কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের হানায় প্রাণ হারিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। এই মর্মান্তিক ঘটনার ১৪ বছর কেটে গেলেও সেই পরিবারগুলি কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। অবশেষে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর কলকাতা হাইকোর্ট মৃত ওই তিন পরিবারের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিংহ রাজ্য বন দফতরকে আট সপ্তাহের মধ্যে এই ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

গোসাবার লাহিড়ীপুর পঞ্চায়েতের বাসিন্দা নিরাপদ মণ্ডল ২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাছ, কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। তাঁর দেহ উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরে স্ত্রী বীণারানি মণ্ডল বন দফতর সহ বিভিন্ন সরকারি মহলের দরজায় দরজায় ঘুরে দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। এই পরিস্থিতিতে তিন মেয়েকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন বীণারানি দেবী। সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়ে তাঁকে নিজেই মাছ, কাঁকড়া ধরার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশা শুরু করতে হয়। তবে তিনি ক্ষতিপূরণের লড়াই ছাড়েননি। গত বছর তিনি কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। আইনজীবীর খরচ জোগাড়ের সামর্থ্য তাঁর ছিল না, তাই আদালতের তরফ থেকেই তাঁকে আইনি সহযোগিতা করা হয়।

এই মামলার শুনানির পর আদালত মৃত নিরাপদ মণ্ডলের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। নিরাপদ মণ্ডল ছাড়াও ওই একই বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে সুন্দরবনের বাঘের হানায় প্রাণ হারিয়েছিলেন বিশ্বজিৎ মণ্ডল ও অর্জুন মণ্ডল। আদালত তাঁদের পরিজনদেরও নিরাপদ মণ্ডলের পরিবারের মতোই একই অর্থমূল্য পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিংহ বন দফতরকে আট সপ্তাহের মধ্যে এই টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের এই নির্দেশে খুশি বীণারানি দেবী। তিনি জানিয়েছেন, “ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে বিকল্প পেশার চেষ্টা করব, জঙ্গলে আর ঝুঁকি নিয়ে যাব না। স্বামী মারা যাওয়ার পরে তিন সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়েছিলাম। দিনমজুরি করে সংসার চালাই। মাথা গোঁজার ঘরও নেই আমাদের। ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে উপকার হবে।”

সুন্দরবনের বাঘ-কুমিরে আক্রান্ত পরিবার কমিটির পক্ষ থেকে এই রায়ের পর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে বন দফতরের টালবাহানা নিয়ে। তাঁদের অভিযোগ, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে স্থানীয় পঞ্চয়েত বা থানা কেউই আক্রান্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ায় না। ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার জন্য বন দফতরও নানা টালবাহানা করে। মৃতদেহ পাওয়া গেলে বলা হয় নিষিদ্ধ এলাকায় মিলেছে। দেহ পাওয়া না গেলে বলা হয়, বাঘে ধরেছে তার প্রমাণ নেই। কমিটির কথায়, এই তিনটি পরিবার দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ন্যায়বিচার পেলেন। কিন্তু এলাকায় এ রকম ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পরিবার আরও রয়েছে। সরকারকে অনুরোধ, তাঁদেরও পাশে দাঁড়ান এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করুন। আদালতের এই রায় সুন্দরবনের অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য এক আশার আলো জাগিয়েছে।