বিশেষ: প্রত্যেক নেতা-মন্ত্রীদের বেতন কোটি কোটি টাকা! কিভাবে এতটা উন্নত হলো সিঙ্গাপুর?

সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর হাত ধরেই একটি ছোট, দরিদ্র এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ সিঙ্গাপুর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ, সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক রাষ্ট্রে। প্রায় ৩১ বছর (১৯৫৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত) প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি সিঙ্গাপুরের আর্থিক এবং সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

লি কুয়ান ইউ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে একটি দেশের দ্রুত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসনই হলো মূল চাবিকাঠি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তিনি প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে একাধিক সাহসী পদক্ষেপ নেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পার্লামেন্টের সদস্যদের বেতন এক লাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া। তিনি মনে করতেন, কম বেতন পেলেই রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা সহজে অনৈতিক উপার্জনের চেষ্টা করবেন, যা দুর্নীতির জন্ম দেবে। শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, দুর্নীতি দমনের জন্য তিনি কঠোর আইন প্রণয়ন করেন এবং একটি দুর্নীতি দমন কমিশন (সিবিআই রূপে উল্লেখ করা হয়েছে) প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্নীতির অভিযোগে অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীকে গ্রেফতার করে শাস্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। তাঁর এই কঠোর এবং আপোষহীন নীতির ফলেই সিঙ্গাপুরের প্রশাসনে দুর্নীতি আজও প্রায় নেই বললেই চলে এবং দেশটি স্বচ্ছতার উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।

শহরের পরিকাঠামো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজান লি কুয়ান ইউ। ক্রমবর্ধমান যানজট মোকাবিলার জন্য তিনি প্রায় গোটা দেশকেই মেট্রো রেল নেটওয়ার্ক দিয়ে মুড়ে দেন। পাশাপাশি, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরও জোর দেন, যা শহরের বিভিন্ন এলাকাকে সৌন্দর্যবর্ধন করতে এবং হাঁটাচলার যোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে। উন্নত পরিকাঠামোর জেরে সিঙ্গাপুর সিটি পরবর্তীকালে পর্যটনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বহু বহুজাতিক সংস্থাও সেখানে নিজেদের অফিস খোলে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

বহু জাতি ও ভাষার মানুষের দেশ সিঙ্গাপুরে সামাজিক ভেদাভেদ দূর করতেও বিশেষ উদ্যোগী হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। তিনি রীতিমতো আইন পাস করে দেশের সমস্ত সরকারি আবাসনে ভারতীয়, চিনা ও মালয়বাসীদের একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করেন। এই নীতি কার্যকর করার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ভাব ও বিদ্বেষ কমানো এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করা।

লি কুয়ান ইউ-এর শাসনকালে উন্নয়নের এই কাহিনির পাশাপাশি তাঁর স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়েও আলোচনা হয়। তিনি তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে কঠোরভাবে দমন করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেও সীমিত করেন। তবে বিতর্ক থাকলেও, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন তাঁর এই কঠোর শাসন এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন, যা সিঙ্গাপুরকে একটি সমৃদ্ধ এবং সুশীল দেশে পরিণত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাঁর কঠোর শাসন ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি সিঙ্গাপুরকে একটি সমৃদ্ধ এবং সুশীল দেশে পরিণত করেন।

সব মিলিয়ে, লি কুয়ান ইউ ছিলেন একজন অসাধারণ নেতা যিনি তাঁর দেশের আর্থিক এবং সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন। গরিব ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিঙ্গাপুরকে সমৃদ্ধ ও সুশীল দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তাঁর শাসনকালে স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ থাকলেও, তাঁর কঠোর পদক্ষেপগুলিই যে সিঙ্গাপুরের আজকের অবস্থানের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ, তা অস্বীকার করা যায় না।