ওয়াকফ আইন প্রতিবাদে উত্তপ্ত বাংলা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অভিযোগে বিজেপিকে নিশানা মুখ্যমন্ত্রীর

সংশোধিত ওয়াকফ আইন নিয়ে প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অশান্তি চলছে। মুর্শিদাবাদ, মালদহের মতো জেলাগুলিতে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উত্তপ্ত হয়েছে। সুতি, শমসেরগঞ্জ, ফরাক্কা ও জঙ্গিপুরে সংঘর্ষের জেরে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, আহত হয়েছেন বহু মানুষ এবং অনেকেই ঘরছাড়া হয়েছেন। এই উত্তপ্ত আবহেই শনিবার একটি খোলা চিঠি লিখে রাজ্যের মানুষকে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-এর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে এই শক্তিগুলি। মমতা বলেন, “রাজ্যে যে মিথ্যার প্রচার চলছে, তার মূল জড়িতে রয়েছে আরএসএস।” তাঁর বক্তব্য, বিজেপি ও আরএসএস প্ররোচনা দিয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাগুলিকে ব্যবহার করে ‘ভাগাভাগির রাজনীতি’ খেলতে চাইছে।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে দৃঢ়ভাবে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সহিষ্ণুতার জমি, এখানে কোনও সম্প্রদায়কে অসম্মান করা হয় না। তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য অংশে যখন “ধর্ষণ, অত্যাচার ও মনুষ্যত্বের অবমাননায় লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়”, তখন পশ্চিমবঙ্গ তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। তাঁর মতে, বাংলাই দেশের উন্নয়ন ও মানবিকতার মানচিত্রে অগ্রণী রাজ্য। সমাজ সংস্কার বা স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার অতীতের ভূমিকার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, দুর্গাপূজা, কালীপূজা, দোল, হোলি, গঙ্গাসাগর, ঈদ, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, মহাবীর জয়ন্তীর মতো সব উৎসবই এই রাজ্যে আন্তরিকতা ও সমান শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী আরও লিখেছেন, রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করাই প্রশাসনের প্রধান অঙ্গীকার। এই অশান্তির নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের কড়া হাতে দমন করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজ্যের সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষকে শান্তি ও ঐক্য বজায় রেখে একে অপরের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন, রামনবমীর দিন রাজ্যে অশান্তি ছড়ানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বাংলার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে রামনবমী পালন করেছেন। এখন ওয়াকফ আইন নিয়ে আন্দোলনের আবহে ফের উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে কেউ কেউ। তিনি অভিযোগ করেন, “বিজেপি এবং তার সঙ্গীরা যা প্রচার করছে তা মিথ্যা ও অপব্যাখ্যায় ভরা।”
উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে বাংলার পরিস্থিতির তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, “উত্তরপ্রদেশে বুলডোজার চলে, জন্ম দেয় যন্ত্রণার। কিন্তু আমাদের পশ্চিমবঙ্গে যখন কেউ উৎপীড়িত বোধ করেন, আমরা পাশে দাঁড়াই। এটাই আমাদের মানবিকতা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।”
মমতা স্পষ্ট করে বলেন, যারা দাঙ্গার উসকানি দেয়, তারা বাইরে থেকে এসে দাঙ্গা বাধিয়ে পালায়। তিনি রাজ্যের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান, “আমাদেরই ভিতর থেকে একত্রিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বিভেদের প্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না। আসুন, একজোট হয়ে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখি। যারা মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করছে, তাদের বিশ্বাস করবেন না।” দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যারা দাঙ্গার জন্ম দেয়, তারা বাইরে থেকে আসে এবং দাঙ্গা বাধিয়ে পালায়। ভিতর থেকে আমাদেরই লড়তে হবে তাদের খারাপ কাজের বিরুদ্ধে। আমরা একত্রে বাঁচব, লড়ব এবং জিতব।”
চিঠির শেষ অংশে তিনি আরও একবার আবেদন জানান, “দয়া করে ওদের কথায় বিশ্বাস করবেন না। আমরা সকলে মিলেমিশে থাকতে চাই। ওরা সংকীর্ণ নির্বাচনী রাজনীতির কথা ভেবে আমাদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে চায়।” মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, “আমরা একসঙ্গে বাঁচব, লড়ব এবং জয়ী হব। বিশ্বাস রাখুন, ন্যায় হবে। বাংলার মাটিতে কোনও সম্প্রদায়কে কখনওই নিঃসঙ্গ হতে হবে না।”