“স্বায়ত্তশাসন চায় তামিলনাড়ু”- উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করলেন মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন

তামিলনাড়ুর অধিকার রক্ষা এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন। এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ। রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ প্রস্তাব তৈরি করাই হবে এই কমিটির প্রধান কাজ।
মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই তথ্য প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্যগঠিত কমিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, অতীতে রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলো, যা পরবর্তীকালে “সমবর্তী তালিকায়” স্থানান্তরিত হয়েছে, সেগুলোকে পুনরায় রাজ্যের একক নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার উপায় খুঁজে বের করা। অর্থাৎ, রাজ্য সরকার পূর্বে যেসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারত, বর্তমানে কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারই নিয়ন্ত্রণ করছে, সেই বিষয়গুলো রাজ্যের অধীনে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সুপারিশ করবে কমিটি।
এই কমিটিতে আরও দুই জন প্রাক্তন প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছেন, অশোক শেঠি এবং এম ইউ নাগরাজন। তারা ভারতীয় সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বা “ইউনিয়ন অব স্টেটস”-এর ঐক্য বজায় রেখে বর্তমান আইনগুলোর মূল্যায়ন করবেন।
কমিটিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন এবং ২০২৮ সালের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন বিধানসভায় জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ শুধুমাত্র তামিলনাড়ুর জন্য নয়, বরং ভারতের সকল রাজ্যের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।
রাজ্যপাল ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সংঘাত:
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে এই কমিটি গঠনের পদক্ষেপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন বিষয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মেডিকেল ভর্তির জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত বিতর্কিত নিট (NEET) পরীক্ষা থেকে তামিলনাড়ুকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি।
সম্প্রতি, রাজ্যপাল আরএন রবি দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা দশটি বিল অনুমোদন না দেওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট তার এই ভূমিকাকে “ইচ্ছাকৃত” এবং “অবৈধ” বলে উল্লেখ করেছে। এই বিলগুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাতে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবও ছিল।
মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন এই রায়কে “ঐতিহাসিক” বলে স্বাগত জানিয়েছেন এবং রাজ্যপালকে রাজ্যের উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
শিক্ষা রাজ্যের অধীনে ফিরিয়ে আনার দাবি:
বর্তমানে শিক্ষা সমবায়ী বা সমবর্তী তালিকায় থাকায় কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন শিক্ষা পুরোপুরি রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার পক্ষে। এজন্য তিনি সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী বাতিলের দাবি জানিয়েছেন, যার মাধ্যমে পূর্বে “রাজ্য তালিকায়” থাকা শিক্ষাকে কেন্দ্র-রাজ্য উভয়ের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিল।
এছাড়াও, নিট পরীক্ষা নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয় যখন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দুইবার পাস হওয়া একটি রাজ্য বিল খারিজ করেন। ওই বিলে নিট পরীক্ষা বাতিল করে দ্বাদশ শ্রেণির নম্বরের ভিত্তিতে মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
স্টালিন জানিয়েছেন, “কেন্দ্র যদি আমাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে, তবুও আমাদের লড়াই শেষ হবে না। আমরা আইনি পরামর্শ নিয়ে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করব।”
ভাষা বিতর্ক ও শিক্ষা বরাদ্দ:
জাতীয় শিক্ষানীতিতে (এনইপি) তিন ভাষার ফর্মুলা তামিলনাড়ুর সাথে কেন্দ্রের আরেকটি বড় সংঘাতের কারণ। এর ফলে সপ্তম শ্রেণি থেকে তৃতীয় ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা থাকায় তামিলনাড়ুতে “হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার” আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ডিএমকে বলছে, তামিল ও ইংরেজি মিলে তাদের প্রচলিত দুই-ভাষার ফর্মুলাই যথেষ্ট এবং এর বাইরে কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। তারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার শিক্ষা তহবিল আটকে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে।
যদিও বিজেপি এবং প্রধান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ডিএমকে নিজেরাই পূর্বের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে।
নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাত:
ডিএমকে এবং বিজেপির মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমশ রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। এর মধ্যে আসন পুনর্বিন্যাস নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে, যা উত্তর ভারতের হিন্দি ভাষাভাষী রাজ্যগুলোকে বেশি আসন দিতে পারে এবং তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব কমাতে পারে।
তামিলনাড়ুতে ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির শক্ত কোনও অবস্থান নেই এবং ২০২৬ সালে রাজ্যটিতে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র-রাজ্য টানাপড়েন এবং রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে স্টালিনের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।