কর্মীর অভাবে ধুঁকছে ড্রাগ কন্ট্রোল, জাল ওষুধ প্রমাণের আগেই খেয়ে ফেলছেন রোগীরা!

বাজারে প্রায়শই ধরা পড়ছে জাল ওষুধের একের পর এক ব্যাচ। কিন্তু নমুনা সংগ্রহ, ল্যাব পরীক্ষা এবং গুণগত মানে অনুত্তীর্ণ হওয়ার ফল জানতে জানতেই কেটে যাচ্ছে দু’-তিন মাস। চিকিৎসকদের উদ্বেগ এখানেই। কারণ, এই দীর্ঘ সময়ে বাজার থেকে সেই ভেজাল ওষুধের সিংহভাগই হয়তো বিক্রি হয়ে ব্যবহৃতও হয়ে গিয়েছে!
স্বাস্থ্যকর্তারা একান্তে স্বীকার করছেন, রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল হোক বা কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল, উভয়েই তীব্র কর্মী সঙ্কটে ভুগছে। এই কারণেই দেশের কিংবা রাজ্যের সর্বত্র বাজার থেকে নিয়মিত ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করাই সম্ভব হয়ে উঠছে না। আবার নমুনা সংগ্রহের পরেও ল্যাব পরীক্ষার ফল আসতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে, যত দিনে ড্রাগ কন্ট্রোল ল্যাব টেস্টে কোনও ওষুধ ফেল করেছে বলে জানতে পারছে, তত দিনে সেই ওষুধ সম্ভবত আর দোকানে অবিক্রিত অবস্থায় নেই। রোগীরা না জেনেই সেই ওষুধ ব্যবহার করছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন না কেন তাদের রোগ সারছে না!
এই পরিস্থিতিতে ড্রাগ কন্ট্রোলের দুর্বল পরিকাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ডাক্তার হিসেবে আমরা রোগ নির্ণয় করে যথাযথ ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখি। কিন্তু বাজারে ভেজাল ও জাল ওষুধের যা বাড়বাড়ন্ত, তাতে সেই ওষুধ আদৌ কাজ করলো কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন! মুশকিল হল, রোগ না সারলে লোকে ডাক্তারকে দোষ দেবে! তাই ড্রাগ কন্ট্রোলের পরিকাঠামোর অভাবে যে এই ভুয়ো ওষুধের কারবার বাড়ছে, সে বিষয়ে সরকারের অবিলম্বে নজর দেওয়া উচিত।’
বাস্তব চিত্র আরও হতাশাজনক। কেন্দ্র এবং রাজ্য, সর্বত্রই ড্রাগ কন্ট্রোলের অবস্থা করুণ। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশনের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার কলকাতা অফিসের চিত্র দেখলেই সারা দেশের পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে যাবে। কলকাতা জ়োনাল অফিসের অধীনে রয়েছে বাংলা-সহ মোট ছয়টি রাজ্য—বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, সিকিম এবং আন্দামান ও নিকোবর। অথচ এই বিশাল অঞ্চলের জন্য কলকাতা জ়োনাল অফিসে রয়েছেন মাত্র চার জন ড্রাগ ইনস্পেক্টর। তাঁদের পক্ষে কত দিন অন্তর বাজার থেকে কতগুলি ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্টে পাঠানো সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়।
রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের অবস্থাও তথৈবচ। সেখানে শূন্য পদের পাহাড়। গত চার বছর ধরে কোনও পূর্ণ সময়ের অধিকর্তাই নেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। স্বাস্থ্যভবনের এক আমলাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা হিসেবে। তাঁর ঠিক নীচের পদ এবং একই পদমর্যাদার অতিরিক্ত অধিকর্তার পদটিও খালি। ৩৫ জন সহকারী অধিকর্তার পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ২৯ জন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, ওষুধের গুণমান নিয়ন্ত্রণে নজরদারি চালানোর মূল স্তম্ভ—ইনস্পেক্টর ও সিনিয়র ইনস্পেক্টরদের টিম—একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইনস্পেক্টরের ৯০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৭ জন। আর সিনিয়র ইনস্পেক্টরের ৫০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে একজনও কর্মী নেই!
পরিসংখ্যান স্পষ্ট, রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলে মোট ১৮৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১১৩ জন। আর ওষুধ নজরদারির দায়িত্বে থাকা টিমে ১৪০ জনের বদলে রয়েছেন মাত্র ৭৭ জন। অর্থাৎ, প্রায় ৫০ শতাংশ পদ শূন্য। অথচ এই ড্রাগ ইনস্পেক্টরদেরই নতুন ওষুধের দোকানকে লাইসেন্স দেওয়ার আগে এবং লাইসেন্স নবীকরণের আগে পরিদর্শন করতে হয়। বাজার থেকে নিয়মিত ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো, ব্লাড ব্যাঙ্ক পরিদর্শন, ওষুধ ও ব্লাড ব্যাগ প্রস্তুতকারী সংস্থা পরিদর্শন, বাজারে নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি পুলিশ-আদালতের আইনি ঝামেলাও সামলাতে হয় তাঁদেরকেই। ফলে সেই ‘নিয়মিত’ নজরদারির ব্যবধান কত দিনের, তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ, রাজ্যে ওষুধের দোকানের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।
স্বাভাবিকভাবেই, ভিন রাজ্য থেকে লাগাতার আসা জাল ওষুধ সরবরাহ ও বণ্টনের চোরা স্রোতের সিংহভাগই ড্রাগ কন্ট্রোলের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে যে বিপুল পরিমাণে জাল ও ভেজাল ওষুধ ঘুরছে এবং তার সামান্য অংশ ধরা পড়লে সংবাদমাধ্যম ও স্বাস্থ্য মহলে যেটুকু হইচই হচ্ছে, তা আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ড্রাগ কন্ট্রোলের দুর্বল পরিকাঠামোর কারণে সাধারণ মানুষ না জেনেই ভেজাল ওষুধ ব্যবহার করছেন এবং রোগের উপশম না হওয়ায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং ড্রাগ কন্ট্রোলের পরিকাঠামো শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।