“চিকিৎসা চালাব কী ভাবে? সন্তানকে আর বড় হতে দেখতে পাব?”-চাকরিহারা শিক্ষক সুশান্তের আর্তনাদ

প্রবল ইচ্ছে ছিল, নেতাজি ইন্ডোরে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যাবেন। হয়তো সেখান থেকে ভেসে আসবে এমন কোনও আশ্বাস, যা তাঁদের বর্তমান সঙ্কট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারবে। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতা সেই সভায় যেতে বাধা দিল সুশান্ত দত্তকে। ২০১৬ সালে এসএসসির মাধ্যমে উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার মাঝিয়ালি হাইস্কুলে ইতিহাসের শিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। একটি স্বাভাবিক জীবন হঠাৎই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে ২০২২ সালে, যখন তাঁর শরীরে ধরা পড়ে ব্লাড ক্যান্সার।

তখন থেকে ওরাল কেমোথেরাপির উপরে ভরসা করে চলছে সুশান্তের জীবনযুদ্ধ। প্রতি চার মাস অন্তর মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতালে যেতে হয় তাঁকে। প্রতিবার মুম্বই যাওয়া এবং চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। এর উপর প্রতি মাসে ওষুধের খরচ ৯ হাজার টাকা। চিকিৎসকদের স্পষ্ট নির্দেশ, এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা তাঁকে আজীবন চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সুশান্ত এখন চাকরিহারা। আয়ের একমাত্র পথ বন্ধ। আগামী ১৯ মে তাঁর ফের মুম্বই যাওয়ার কথা, কিন্তু এত টাকা তিনি কোথা থেকে জোগাড় করবেন, তা জানেন না।

ইসলামপুরের দুর্গানগরে স্ত্রী ও তিন বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে ভাড়াবাড়িতে থাকেন সুশান্ত। তাঁর একার উপার্জনেই চলত সংসার। চোখের জলে তিনি বলেন, ‘টিভিতে মুখ্যমন্ত্রীর সভা দেখলাম। কিন্তু আমার মতো অসহায় মানুষের কথা একটিবারও উঠল না। ভলান্টিয়ারি সার্ভিসের কথা বলা হলো, কিন্তু আমার শরীরে তো সেই শক্তিটুকুও নেই। প্রতিদিন কেমোথেরাপির ওষুধ খাই।’

স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করলে আদৌ বেতন মিলবে কিনা, সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে গেছে সুশান্তের। একটিমাত্র প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁকে – ‘চিকিৎসা চালাব কী ভাবে? পরিবারের কী হবে? কে দেখবে ওদের?’

প্রতিবেশীরা সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, কিন্তু সেই সহানুভূতিতে তো আর চিকিৎসার খরচ মেটানো যাবে না। সুশান্তের আকুতি, ‘আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই কারও কাছে। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিতে আসছেন, কিন্তু কেউই জানেন না, কী ভাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে।’

এই কঠিন পরিস্থিতিতে কোনও দিশা খুঁজে না পেয়ে, স্কুলের পরিদর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনও সাড়া মেলেনি। এখন সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ পিটিশনের দিকে তাকিয়ে আছেন সকলে, সুশান্তও সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তবে ক্রমশ মনোবল ভেঙে যাচ্ছে তাঁর। হতাশার সুরে বলছেন, ‘আমি কি আমার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারব? আমার সন্তানকে আর বড় হতে দেখতে পাব? স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন ছাড়া আর কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছি না।’ সুশান্তের এই আর্তনাদ যেন চাকরিহারা আরও হাজার হাজার শিক্ষকের নীরব যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।