শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ? তোড়জোড় শুরু বাংলাদেশের ইউনুস সরকারের

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে, এমনটাই জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম। খুব শীঘ্রই এই মামলার চার্জশিট ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, মোট চারটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সরাসরি শেখ হাসিনাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনের তীব্রতায় তিনি দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ওই আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রো-আওয়ামী লীগ বাহিনী যে হিংসাত্মক দমন অভিযান চালায়, তাতে প্রায় ২,০০০ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থী। এছাড়াও, তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুম ও গ্রেফতারের মতো গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে।
ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ:
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহম্মদ ইউনূস ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছেন। যদিও ভারত সেই বার্তা গ্রহণ করেছে, তবে এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আরও জানান যে, শেখ হাসিনা সহ মোট ১৪১ জন প্রাক্তন মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং প্রভাবশালী নেতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে বর্তমানে ৫৪ জন পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন এবং বাকি অভিযুক্তরা পলাতক। ট্রাইব্যুনালে ইতিমধ্যেই ৩৩৯টি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির নির্দেশ:
ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যেই ১০ জন পলাতক প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করার জন্য বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্রাক্তন সড়ক পরিবহণমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রাক্তন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক, প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকি, প্রাক্তন তথ্য প্রতিমন্ত্রী আলি আরাফাত, প্রাক্তন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং দক্ষিণ ঢাকার প্রাক্তন মেয়র ও শেখ হাসিনার ভাইপো শেখ ফজলে নূর তাপস।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম:
প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আরও জানান, তদন্তের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে তাঁরা ইতিমধ্যেই পুলিশের আইজিপি’র কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একাধিক আবেদন করেছেন এবং ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদনগুলি অনুমোদন করেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতরের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের ১৫ই জুলাই থেকে ১৫ই অগাস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে এই সংখ্যা ১,৫০০ থেকে ২,০০০-এর মধ্যে বলে দাবি করা হয়েছে। শেখ হাসিনার মতো একজন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত ও অভিযোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, এই মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় এবং অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া কতদূর এগোয়।