বিশেষ: আরবের মরুভূমিও একসময় হ্রদ, নদী, বনে পূর্ণ ছিল, জানালো গবেষকরা

বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক স্থান আরব মরুভূমি। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রুক্ষ অঞ্চলটিও একসময় হ্রদ, নদী এবং সবুজ রেইনফরেস্টে পরিপূর্ণ ছিল।
বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট নোরিজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রায় ৯ হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সবুজ পরিবেশ বিদ্যমান ছিল। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল এই বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছেন। গবেষণার জন্য তারা ‘রুব আল খালি’ নামের এক বিশাল মরুভূমি নিয়ে কাজ করেছেন, যা ‘খালি কোয়ার্টার’ নামেও পরিচিত।
গবেষণা দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সুইজারল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ জেনিভা’র অধ্যাপক ড. আবদাল্লাহ জাকি ও অধ্যাপক সেবাস্তিয়ান ক্যাসেলটর্ট এবং সৌদি আরবের ‘কেএইউএসটি’র অধ্যাপক আবদুল কাদের আফিফি। অস্ট্রেলিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অফ গ্রিফিথ’-এর অধ্যাপক মাইকেল পেট্রাগ্লিয়ারের সঙ্গে আরব মরুভূমির ভূমি ও এর প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানে একযোগে কাজ করেছেন তারা।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি প্রাচীন হ্রদ, নদী এবং এমনকি প্রবাহিত জলের স্রোতের চিহ্নযুক্ত এক দীর্ঘ উপত্যকার প্রমাণ পেয়েছেন। এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, এককালে এই মরুভূমি এমন একটি অঞ্চল ছিল, যেখানে বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হত।
ড. জাকি জানিয়েছেন, প্রায় ৯ হাজার বছর আগে হ্রদটির আকার ছিল বিশাল। গবেষকরা এই সময়কালকে ‘সবুজ আরব’ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই আর্দ্র সময়কাল স্থায়ী ছিল প্রায় ১১ হাজার থেকে ৫ হাজার পাঁচশ বছর আগে পর্যন্ত।
এই প্রাচীন হ্রদটি ছিল এক হাজার একশ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রায় ৪২ মিটার গভীর। অধ্যাপক ক্যাস্টেলটর্ট বলেছেন, ওই সময় এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ার কারণেই হ্রদটির আকার এত বড় হয়ে উঠেছিল যে, শেষ পর্যন্ত এর ভেতরের জল উপচে পড়ে।
হ্রদটির জল উপচে পড়ার ফলে ওই অঞ্চলে এক বিশাল বন্যার সৃষ্টি হয়। আর এই বন্যার কারণে মরুভূমিতে তৈরি হয় দেড়শ কিলোমিটার দীর্ঘ এক উপত্যকা।
গবেষণা দলটি বলছে, ওই সময় এই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল আফ্রিকার মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে, যা লোহিত সাগরের ওপার থেকে বয়ে এনেছিল আর্দ্রতা। গবেষকরা এই ধারণার প্রমাণ পেয়েছেন অঞ্চলে পাওয়া মাটি ও পলির ধরনের মাধ্যমে, যা এর কাছাকাছি ‘আসির’ পর্বতমালা থেকে আসা বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রাচীন মানব জীবন নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক পেট্রাগ্লিয়া বলেছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সেই সময়ে সেখানে বসবাসকারী মানুষের ওপর এর বড় প্রভাব পড়েছিল। হ্রদ, নদী ও বিভিন্ন সবুজ তৃণভূমির এমন পরিবেশ শিকারী, সংগ্রহকারী ও প্রাথমিক কৃষকদের আকৃষ্ট করতে পারত। এমন পরিবেশ তাদের বেঁচে থাকার পাশাপাশি আরও সহজে অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।
তবে প্রায় ৬ হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যায়। এলাকাটি পুনরায় শুষ্ক হয়ে ওঠে এবং সেখানকার বাসিন্দারা আরও জলের সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন।
গবেষকরা বলছেন, এসব কারণে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল এবং অনেক যাযাবর গোষ্ঠী এই নতুন ও কঠোর মরুভূমির অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই গবেষণা কেবল পরিবেশ কতটা বদলেছে তাই নয়, বরং প্রাচীন মানুষ কীভাবে তাদের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিল সেই বিষয়টির ওপরও আলোকপাত করেছে।
গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে।