বাবার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ছেলে জানলো ডেথ সার্টিফিকেট জাল!- কিছুই করতে না পেরে অথৈ জলে সন্তান

পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের বাসিন্দা সৌমেন্দু দে বাবার মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে একটি ডেথ সার্টিফিকেট পেয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছর পর পুলিশের তদন্তে জানা যায়, সেই সার্টিফিকেট জাল। মেদিনীপুর পুরসভা তাঁকে জানিয়েছে, ওই নথি আর ব্যবহার করা যাবে না। এরপরও প্রায় এক বছর কেটে গেলেও বৈধ ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাননি সৌমেন্দু। ফলে বাবা প্রবোধচন্দ্র দে’র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে সম্পত্তি হস্তান্তরসহ কোনও আইনি কাজ করতে না পেরে তিনি বিপাকে পড়েছেন। সরকারি দপ্তরে বারবার ঘুরেও সমাধান না মেলায় এবার তিনি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ঘটনার সূত্রপাত

২০১৯ সালের ২২ নভেম্বর মেদিনীপুর শহরের একটি নার্সিংহোমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রবোধচন্দ্র দে’র মৃত্যু হয়। নার্সিংহোম থেকে চিকিৎসক সৌভিক মণ্ডলের সই করা একটি ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে মেদিনীপুর পুরসভা সরকারি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করে। কিন্তু প্রবোধচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সৌমেন্দু নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে মামলা করেন। স্বাস্থ্য কমিশনের তদন্তে নার্সিংহোমের দোষ প্রমাণিত হয় এবং তাদের ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা পান সৌমেন্দু, বাকি ৫ লক্ষ টাকা ঝাড়গ্রামের একলব্য মডেল স্কুলে সিএসআর ফান্ড হিসেবে দেওয়া হয়। এই মামলা বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন, এবং আগামী ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে পুলিশকে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাল সার্টিফিকেটের রহস্য

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, নার্সিংহোম থেকে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেটটি জাল। ২০২৪ সালে পুলিশ এই তথ্য মেদিনীপুর পুরসভাকে জানালে পুরসভা সৌমেন্দুকে নির্দেশ দেয়, তিনি আর ওই সার্টিফিকেট ব্যবহার করতে পারবেন না। পুরসভার দাবি, সার্টিফিকেটে চিকিৎসকের লেখা তারিখ (২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর) ভুল ছিল। তদন্তে আরও প্রকাশ, সৌভিক মণ্ডলের সই করা সার্টিফিকেটে ব্যবহৃত রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি অন্য একজন চিকিৎসকের। সৌভিক বৃহস্পতিবার দাবি করেন, “আমার সঙ্গে এই ঘটনার কোনও যোগ নেই। আমার সই নকল করা হয়েছে।” নার্সিংহোমের অন্যতম ডিরেক্টর পার্থ মণ্ডল বলেন, “বিচারাধীন বিষয়ে কোনও মন্তব্য করব না।”

পুরসভার বক্তব্য

মেদিনীপুরের পুরপ্রধান সৌমেন খান জানান, “আমরা বিষয়টি নার্সিংহোম এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলকে জানিয়েছি। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার ভিত্তিতে আমরা পদক্ষেপ নেব। এখনও কোনও উত্তর পাইনি, তাই নতুন ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারিনি।” তবে ইতিমধ্যে জাল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে প্রবোধচন্দ্রের পেনশন বন্ধ করে তাঁর স্ত্রীর নামে ফ্যামিলি পেনশন চালু হয়ে গেছে।

সৌমেন্দুর দুর্দশা

সৌমেন্দু বলেন, “বাবার মৃত্যুর প্রায় ছ’বছর হতে চলল। বৈধ ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া আমি বাবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা সম্পত্তির কোনও কাজ করতে পারছি না। সরকারি দপ্তরে ঘুরে ঘুরে হয়রান হচ্ছি।” তিনি জানান, মায়ের পেনশন নিয়মিত আসলেও অন্যান্য আইনি জটিলতার সমাধান না হওয়ায় তিনি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তদন্তের অপেক্ষা

এই ঘটনা নার্সিংহোমের দায়িত্বহীনতা এবং জাল নথির ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশের তদন্তে কী উঠে আসে এবং কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে সৌমেন্দু কবে বৈধ সার্টিফিকেট পান, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে তাঁর ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ।