“হইচইয়ে থমকাল মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ”- তিরে বাম-গেরুয়া শিবির ও সাম্প্রদায়িক শক্তি

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ কলেজে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণের সময় বাম, অতিবাম ও গেরুয়া শিবিরের লোকজন পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার মমতার বক্তৃতা চলাকালীন প্রেক্ষাগৃহে ১০-১২ জন শ্রোতা সিঙ্গুর, আরজি কর এবং সংখ্যালঘু-অসংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন। এই প্রশ্নের জেরে উত্তেজনা ছড়ায় এবং হইচইয়ের মধ্যে একপর্যায়ে মমতা ভাষণ থামিয়ে দিতে বাধ্য হন।
প্রশ্নের ঝড়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি
মমতার ভাষণে সংখ্যালঘুদের উল্লেখ থাকলেও অসংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গ কেন নেই, তা নিয়ে কয়েকজন শ্রোতা প্রশ্ন তুললে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। প্রবল হট্টগোলের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর দুই নিরাপত্তারক্ষী তাঁর পিছনে চলে আসেন। চেঁচামেচি অব্যাহত থাকায় অনুষ্ঠানের লাইভ স্ট্রিমিংয়ের শব্দ কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই ঘটনার জন্য মমতা সরাসরি বাম, অতিবাম ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দায়ী করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, “এখানে রাজনীতি করবেন না। আমার রাজ্যে গিয়ে রাজনীতি করুন। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আপনাদের পার্টিকে শক্তিশালী করুন।”
পুরানো ছবি তুলে ধরে প্রতিক্রিয়া
উত্তেজনার মধ্যে মমতা তাঁর পুরানো একটি ছবি শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন। ছবিতে তিনি চিকিৎসাধীন, মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, বাম জমানায় হাজরায় আন্দোলনের সময় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে থাকাকালীন এই ছবি তোলা। মমতা বলেন, “আমি সকলের কথা বলি—হিন্দু, মুসলিম, শিখ, সব সম্প্রদায়ের। সব ধর্ম-বর্ণের কথা আমার ভাষণে থাকে।”
আরজি কর ও বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
শ্রোতাদের মধ্যে কেউ আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করলে মমতা বলেন, “এটি বিচারাধীন।” এছাড়া, রাজ্যে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলতে শুরু করতেই একজন জিজ্ঞাসা করেন, “কারা বিনিয়োগ করেছে, নাম বলুন।” মমতা উত্তরে বলেন, “আইবিএম, টাটা, উইপ্রো এরা বিনিয়োগ করেছে।” প্রশ্নকর্তা ফের বলেন, “আপনি টাটাকে সিঙ্গুর থেকে তাড়িয়েছেন, কেন অসত্য বলছেন?” মমতা পাল্টা জবাব দেন, “আমি অসত্য বলছি না। খড়্গপুরে টাটার বিনিয়োগ রয়েছে।”
‘পরিকল্পিত ঝামেলা’র অভিযোগ
মমতা সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, তৃণমূল বিরোধী শক্তি পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাষণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আপনাদের নেতারা এলে তাঁদের সঙ্গেও একই জিনিস হবে।” বিক্ষোভকারীদের কেলগ কলেজের অসম্মান করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তিনি যোগ করেন, “আপনারা বিরোধিতা করতেই পারেন। আমি এতে উৎসাহ পাই।” ঘটনার শেষে কেলগ কলেজ কর্তৃপক্ষ মমতার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন।
অক্সফোর্ডে মমতার দিন
ভাষণের আগে মমতা অক্সফোর্ডের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে রাজ্যের প্রশাসন, সংস্কার ও সামাজিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাব্দীপ্রাচীন ক্যাম্পাস ও গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন এবং কিছু পড়ুয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও সেখানে উপস্থিত হন। পরে একটি হোটেলে বিশ্রামের সময় মমতা পুরানো পিয়ানোতে ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ ও ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ গানের সুর বাজান।
অক্সফোর্ডে মমতার ভাষণে ঝড়ো পরিস্থিতি বাংলার রাজনীতির তীব্রতা বিদেশের মাটিতেও প্রতিফলিত করেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিরোধীরা পরিকল্পিতভাবে এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। মমতা শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলালেও, এই ঘটনা আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও উসকে দিতে পারে।