চিনের আগে ভারত সফর চেয়েছিলেন ইউনূস, প্রস্তাবে পাত্তাই দেয়নি কেন্দ্র সরকার

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস চিনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ বিমানে চিনের হাইনান প্রদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে শীতল থাকার মধ্যে ইউনূসের এই সফর বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ইউনূস ভারতের প্রতি একটি কৌশলগত বার্তা দিতে চাইছেন।

প্রথম বিদেশ সফরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

নোবেলজয়ী ইউনূসের এটি প্রথম দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর, এবং গন্তব্য হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন চিন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন বিদেশ, বিদ্যুৎ, খনিজ, সড়ক পরিবহন, রেল উপদেষ্টা এবং প্রেস সচিব। চার দিনের এই সফরে ইউনূস চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’তে ভাষণ দেবেন, চিনের উচ্চ প্রযুক্তি পার্ক ও হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন এবং পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিয়ে সাম্মানিক ডক্টরেট গ্রহণ করবেন।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার লক্ষ্য

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে টলমল অবস্থায় রয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে ইউনূস চিনের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) আদায়ের চেষ্টা করছেন। স্বাস্থ্য খাতে ১৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদানও আনার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় চিনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ইউনূসের অন্যতম লক্ষ্য।

চিনের প্রভাব বৃদ্ধি

চিন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী দেশ। পরিকাঠামো, ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতে চিনের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ১৪টি চিনা সংস্থা ২৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এই সফরের মাধ্যমে ঢাকায় বেজিংয়ের প্রভাব আরও বাড়তে পারে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ভারতের জন্য উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে চিনের অংশগ্রহণ বাড়লে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও তীব্র হবে। ইউনূসের চিন সফরকে অনেকে ভারতের প্রতি একটি ‘বার্তা’ হিসেবে দেখছেন, যা দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের শীতলতাকে আরও উসকে দিতে পারে।

ভারতের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইউনূসকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদী তাঁর বার্তায় ‘পরস্পরের প্রতি সংবেদনশীলতা’ বজায় রাখার আহ্বান জানান, যাকে বিশেষজ্ঞরা কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন। এর মাধ্যমে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ঢাকাকেই উদ্যোগী হতে হবে।

হিন্দু নির্যাতনে ভারতের অসন্তোষ

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনা ভারতকে উদ্বিগ্ন করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে ৭৬টি হামলায় ২৩ জন হিন্দু নিহত এবং ১৫২টি মন্দির ভাঙচুর হয়েছে। ইউনূস সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও টানাপড়েনের দিকে ঠেলেছে। ভারত বারবার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সীমান্তে স্থিতিশীলতার দাবি জানিয়েছে।

ইউনূসের চিন সফর কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভারসাম্যে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের প্রত্যাখ্যানের পর চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর এই পদক্ষেপ কীভাবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।