বিশেষ: দিঘায় মিললো প্রবাল-খেকো মাছ, প্রবাল প্রাচীর কি তবে কাছেই? কী বলছে গবেষণা?

পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় সমুদ্রতট দিঘায় এখন প্রায়শই জেলেদের জালে ধরা পড়ছে প্রবাল-খেকো মাছ। স্থানীয়রা এই মাছকে এমন নামে ডাকছেন কারণ এটি সমুদ্রের প্রবাল খেয়ে বেঁচে থাকে। শুধু তাই নয়, প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল আইল্যান্ডের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন মাছেরও দেখা মিলছে দিঘার সমুদ্রে। তবে এই মাছগুলি দিঘায় এল কীভাবে? এই প্রশ্ন এখন গবেষক ও সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
দিঘা মোহনা থেকে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জালে এই রকমারি মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল স্ক্যারাস ঘোব্বান (Scarus ghobban), যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্যারট ফিশ বলা হয়। এই মাছ দেখতে অনেকটা রুই মাছের মতো, তাই স্থানীয় জেলেরা একে ‘সামুদ্রিক রুই’ নামেও ডাকেন। এছাড়া, মোরে ইলস, ফ্লাইং গার্নার্ডস, স্করপিয়ন ফিশ, সি রবিন, অ্যাঞ্জেল ফিশ, বাটারফ্লাই ফিশ এবং স্কুইরেল ফিশের মতো প্রজাতিরও সন্ধান মিলেছে।
প্রবাল প্রাচীরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন
এই মাছের উপস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলে, দিঘার কাছাকাছি কোথাও প্রবাল প্রাচীর রয়েছে? সমুদ্রবিজ্ঞানী ও জীববিদ্যার গবেষকরা এই বিষয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন। তাঁদের প্রাথমিক ধারণা, দিঘার কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রবাল প্রাচীর না থাকলেও ছোট ছোট প্রবালের অস্তিত্ব থাকতে পারে। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, জেলেদের জালে এই মাছের সঙ্গে ছোট ছোট প্রবালও উঠে আসছে। গবেষকদের মতে, প্রবাল না থাকলে এই মাছের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
তবে দিঘার সমুদ্রে প্রবাল জন্মানোর সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন গবেষকরা। কারণ, এখানকার জল অত্যধিক কর্দমাক্ত। প্রবাল জন্মানোর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও দূষণমুক্ত জল, যা ভেদ করে সূর্যের আলো সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছতে পারে। দিঘার জলে এই পরিস্থিতি না থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে এই মাছের দেখা মিলছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে এক রহস্য।
গবেষণায় কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
২০১১ সালে জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার হায়দরাবাদের ফ্রেশওয়াটার বায়োলজি রিজিওনাল সেন্টারের গবেষক প্রসন্ন ইয়েন্নাওয়ার এবং দিঘার মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম রিজিওনাল সেন্টারের গবেষক প্রসাদচন্দ্র টুডু, দীপাঞ্জন রায় ও অনিল মহাপাত্র এই বিষয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। তখনই প্রথম দিঘার মোহনায় এই মাছের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুরের বাজকুল কলেজের প্রাণিবিদ্যার শিক্ষক দীপাঞ্জন রায় জানান, “স্ক্যারাস ঘোব্বান সবচেয়ে বেশি মিলছে। জেলেরা যেখানে মাছ ধরেন, সেখানে প্রবালের উপস্থিতি নিশ্চিত। ১৯৯০ সালে ওড়িশার গঞ্জামে ডুবন্ত প্রবাল দ্বীপের সন্ধান মিলেছিল। এটা হয়তো ধীরে ধীরে অন্যত্র ছড়াচ্ছে। তবে সঠিক তথ্যের জন্য আরও গবেষণা দরকার।”
জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষক অনিল মহাপাত্র বলেন, “গোপালপুরে কিছু প্রবাল রয়েছে, বাংলাদেশের কিছু এলাকাতেও প্রবাল আছে। দিঘার জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে বাংলাদেশ বা গোপালপুর, পুরীর উপকূল পর্যন্ত চলে যান। তাই এই মাছ কোথা থেকে আসছে, তা নিশ্চিত হতে হবে।” তিনি আরও বলেন, দিঘার সমুদ্রে নদী থেকে আসা কাদার পরিমাণ বেশি থাকায় সূর্যের আলো তলদেশে পৌঁছতে পারে না, ফলে প্রবাল জন্মানোর সম্ভাবনা কম।
প্রবালের গুরুত্ব
গবেষকরা জানাচ্ছেন, সমুদ্রে প্রবালের উপস্থিতি জলের দূষণ কম থাকার ইঙ্গিত দেয়। প্রবালের সঙ্গে থাকে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী ও মাছ, যা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণ বাড়ায়। এছাড়া প্রবাল প্রাচীর উপকূলীয় ভাঙন, সামুদ্রিক ঢেউ এবং সুনামির বেগ কমাতে সক্ষম। দীপাঞ্জনবাবুর মতে, “এই বিষয়ে বিশদ গবেষণা জরুরি। এটা বোঝা দরকার যে প্রবাল ও এই মাছগুলি দিঘার জন্য কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।”
দিঘার সমুদ্রে প্রবাল ও এই মাছের রহস্য উন্মোচনে আরও গবেষণার অপেক্ষায় রয়েছে বিজ্ঞানীরা। এটি বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।