গাজায় ইজরায়েলের ভয়াবহ এয়ারস্ট্রাইক, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ, ১০০-র বেশিমৃত্যু

গাজা উপত্যকায় সাম্প্রতিক অতীতের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। মঙ্গলবার ভোরে একের পর এক মিসাইলের বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে গাজার আকাশ ও মাটি। যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে ইজরায়েলি বোমারু বিমান গাজা সিটি, দেইর আল-বালাহ, খান ইউনিস এবং রাফাহ’সহ একাধিক এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছে। এই হামলায় এখনও পর্যন্ত ১০০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।
যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন
মঙ্গলবার ভোরের এই হামলা গত জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সিরিয়াল বোমাবর্ষণে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রায় ১০০ গাজাবাসীর মৃত্যু হয়েছে। প্যালেস্তাইনের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে আহতদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, নিহতদের বেশিরভাগই শিশু, কারণ হামলাগুলো মূলত লোকালয়ে সংঘটিত হয়েছে। বোমার আঘাতে একের পর এক বাড়ি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণ। এই হামলায় গাজায় এক নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জানা ছিল
আশ্চর্যজনকভাবে, এই হামলার আগে পুরো বিষয়টি জানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হামলা শুরুর সময়ে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান, ইজরায়েল হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, “আজ রাতে গাজায় হামলার বিষয়ে ইজরায়েলিরা ট্রাম্প প্রশাসন এবং হোয়াইট হাউসের পরামর্শ নিয়েছিল।” তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাস, ইরান-সমর্থিত হুথি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কোনও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য তাদের “চরম মূল্য” দিতে হবে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির পটভূমি
গত ১৯ জানুয়ারি ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, হামাসকে ৫৯ জন ইজরায়েলি যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দিতে হবে। হামাস অল্প সংখ্যায় বন্দীদের মুক্তি দিলেও, ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে সব বন্দীকে মুক্তির দাবি জানায়। হামাস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় আলোচনা ভেস্তে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ইজরায়েলের এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি ব্যর্থতার ফলাফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দফতর জানিয়েছে, হামাস বারবার বন্দী মুক্তিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
হামাসের প্রতিক্রিয়া
হামাসের এক প্রতিনিধি পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, ইজরায়েল একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি বাতিলের চেষ্টা করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই হামলার ফলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর প্রায় ২,০০০ প্যালেস্তাইনি বন্দীর বিনিময়ে ৩৩ জন ইজরায়েলি এবং ৫ জন থাই যুদ্ধবন্দী মুক্তি পেয়েছিল।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
ইজরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হামলাগুলো হামাস কমান্ডারদের বাড়ি এবং তাদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তবে, প্যালেস্তাইনের চিকিৎসক এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গাজা শহরের একটি বড় বিল্ডিং এবং দেইর আল-বালাহ’র লোকালয়ে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে গেছে। তাঁরা ইজরায়েলের ‘শুধু হামাসের ঘাঁটিতে হামলা’র দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হাসপাতালে সংকট
প্যালেস্তাইনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার হাসপাতাল ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই দুর্বল ছিল। এই হামলায় একসঙ্গে এত হতাহতের চাপ সামলাতে স্বাস্থ্যকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার কাজ চললেও, অনেকে এখনও নিখোঁজ।
এই হামলা গাজার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন ইজরায়েল ও হামাসের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।