“কাঁচা ধানে মই দিল হাতির দল”- ঝাড়গ্রামে হাতির তাণ্ডবে ফসল নষ্ট, ক্ষতির মুখে চাষিরা

ঝাড়গ্রামে ফের হাতির তাণ্ডব। স্বামী-স্ত্রী সারা রাত লাঠি আর টর্চ হাতে ফসল পাহারা দিয়েও শেষরক্ষা হল না। ভোর তিনটে নাগাদ বাড়ি ফিরে এসে সকালে দেখা গেল, হাতির দল জঙ্গল থেকে বেরিয়ে জমির উপর দিয়ে হেঁটে ফসল তছনছ করে দিয়েছে। এই ঘটনায় ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের মানিকপাড়া রেঞ্জের কুসুমঘাঁটি বিটের গোবিন্দপুর গ্রামের চাষিরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
হাতির হানার বিবরণ
শনিবার রাত তিনটে নাগাদ গোবিন্দপুর গ্রামে একদল হাতি ঢুকে পড়ে। তার আগে পর্যন্ত গ্রামের চাষি হারাধন মাহাতো ও তাঁর স্ত্রী পার্বতী নিজেদের জমির ফসল বাঁচাতে সারা রাত পাহারায় ছিলেন। ভোরে বাড়ি ফিরে এসে সকালে জমিতে গিয়ে তাঁরা দেখেন, বিঘার পর বিঘা ধানের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে হারাধন বলেন, “আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। এতদিন ধরে ফসল বাঁচাতে রাত জেগে পাহারা দিয়েছি। শনিবারও ছিলাম। কিন্তু সকালে এসে এই দশা।” হারাধনের মতোই গ্রামের অন্য চাষিদেরও একই অবস্থা।
বারবার হাতির উৎপাত
ঝাড়গ্রামে হাতির তাণ্ডব নতুন নয়। প্রায়ই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে গ্রামে হানা দেয় হাতির দল। কখনও স্কুলের মিড-ডে মিলের চাল খেয়ে ফেলে, কখনও মানুষকে আহত করে। এমনকী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কিছুদিন আগে এক ব্যক্তির মাটির বাড়ির দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল একটি বুনো হাতি। এক মহিলাকে আছড়ে ফেলে আহত করেছিল, যিনি এখন ওডিশার কটকে চিকিৎসাধীন। এবার ফসলের ওপর দিয়ে হেঁটে ও খেয়ে ধান নষ্ট করে দিয়েছে হাতিরা।
ক্ষতির পরিমাণ
বন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গোবিন্দপুরে প্রায় ১০০ বিঘা জমির মধ্যে ২০-২২ বিঘায় ধান চাষ হয়েছিল। হাতির হানায় এই ফসল প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এক চাষি জানান, “রাতে ফসল ঠিকঠাক ছিল। সকালে এসে দেখি, কোথাও হাতি খেয়ে গেছে, কোথাও ওপর দিয়ে হেঁটে তছনছ করে দিয়েছে।” হারাধন মাহাতো, কমল মাহাতো, স্বপন মাহাতো ও আকাশ মাহাতো—এই চার চাষির মোট ১০ বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
বন দপ্তরের বক্তব্য
ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের ডিএফও উমর ইমাম জানিয়েছেন, “দশটি হাতির একটি দল পুকুরিয়া থেকে গোবিন্দপুরে এসেছে। খাবারের সন্ধানেই তারা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে। চাষিরা আবেদন করলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।” তবে তিনি বলেন, “প্রতিদিন হাতি তাড়ানো সম্ভব নয়। বেশি ড্রাইভ করলে হাতি উগ্র হয়ে উঠতে পারে, ফলে ক্ষতি আরও বাড়বে। পরিকল্পনা করে হাতিগুলোকে অন্যত্র পাঠানো হবে।”
চাষিদের আক্ষেপ
চাষিরা মনে করছেন, গোবিন্দপুরের শাল জঙ্গলে লুকিয়ে রয়েছে এই হাতির দল। প্রতি রাতেই তারা ফিরে আসতে পারে। তাঁরা ক্ষতিপূরণের দাবি জানাবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এক চাষির কথায়, “ক্ষতিপূরণ পেলেও ফসল তো ফিরবে না। আর না পেলে নতুন করে চাষ করাও সম্ভব হবে না।” রাত জেগে ফসল পাহারা দিয়েও শেষ পর্যন্ত ক্ষতি এড়াতে না পারায় হতাশ গ্রামের কৃষকরা।
বর্তমান পরিস্থিতি
এই ঘটনায় গোবিন্দপুরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। চাষিরা বন দপ্তরের কাছে ক্ষতিপূরণের আশায় আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে হাতির উৎপাত রোধে স্থায়ী সমাধান না হলে এই ক্ষতি বারবার হতে থাকবে বলে আশঙ্কা তাঁদের। বন বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে এখন সবার নজর।