বিশেষ: গ্রিন হাউস ইফেক্ট থেকে বাঁচার উপায়, জেনেনিন বিশেষজ্ঞদের ১০ টি পরামর্শ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে। বিজ্ঞানের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিস্ময়কর অবদানে মানবজাতি একদিকে যেমন সভ্যতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছে, অন্যদিকে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া মানবজাতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে। প্রাকৃতিক সম্পদে বিনাশ সাধনের ফলে পৃথিবী চরম দুর্দিনের সম্মুখীন হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের ফলে বেড়ে যচ্ছে হাউস ইফেক্ট। মূলত গ্রিন হাউস ইফেক্ট পরিবেশ দূষণের এমন এক বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া যা বিশ্ববাসীকে এক নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রকৃতি হারিয়ে ফেলেছে তার ভারসাম্য ও স্বাভাবিক গতি।

গ্রিন হাউস কী?
ইংরেজি গ্রিন হাউজ শব্দের অর্থ সবুজ ঘর। পৃথিবীর কিছু মেরু অঞ্চলে সূর্যালোকের স্বল্পতার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাক-সবজির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞানীগণ বিশেষ ধরনের কাচের ঘর উদ্ভাবন করেন, যার ভেতরে চাষাবাদ সম্ভব। এ ঘরের ছাদ ও দেয়াল তাপ বিকিরণরোধী বিশেষ ধরনের কাচ দিয়ে তৈরি। গ্রীষ্মকালে এ ঘরে সূর্যালোক ও উত্তাপ প্রবেশ করে কিন্তু বিকিরণ না ঘটায়, তাপ বের হতে পারে না এবং এর ভেতরের পরিবেশ উত্তপ্ত থাকে। তাই সঞ্চিত সূর্যতাপে বৈরী ও শীতার্থ পরিবেশেও শাক-সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানীরা এ বিশেষ ঘরের নাম দিয়েছেন গ্রিন হাউস।

গ্রিন হাউস ইফেক্ট কী?
পৃথিবীকে ঘিরে এর চারপাশে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত রয়েছে ওজোনস্তর। যার ঘনত্ব সব জায়গায় এক রকম নয়। ২৩ কিলোমিটার উর্ধ্বে এর ঘনত্ব অপেক্ষাকৃত কম। এখানে রয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অপর কয়েকটি গ্যাসের বেষ্টনী। এ গ্যাসগুলোকে একত্রে গ্রিন হাউস গ্যাস বলা হয়। এ গ্যাসের বেষ্টনী রাসায়নিক পর্দা হিসেবে কাজ কর। গ্রিন হাউসের কাচের দেয়াল যেভাবে তার ভেতরের উষ্ণতাকে বাইরে বিকিরণ হতে বাধা সৃষ্টি করে, টিক তেমনিভাবে বায়ুমন্ডলে সৃষ্ট রাসায়নিক পর্দা বা গ্যাসের দেয়াল ভূ-পৃষ্ঠের শোষিত তাপের বিকিরণ ঘটাতে বাঁধা দেয়। গ্যাসের এ দেয়াল আছে বলেই কিছু পরিমাণ তাপ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পৃথিবীতে থেকে যায় এবং এর প্রভাবে বায়ুমন্ডল উষ্ণ থাকে। ফলে পৃথিবীতে যে উষ্ণতা থাকে তা জীবের পক্ষে বাসযোগ্য হয়। জীবের বসবাসের অনুকূল এরূপ পরিস্থিতিকে বলা হয় গ্রিন হাউস ইফেক্ট।

গ্রিন হাউস ইফেক্ট-এর কারণ
পৃথিবী বেষ্টনকারী বায়ুমন্ডলের কারণে পৃথিবী বাসোপযোগী হয়েছে। মহাশূণ্যের আবহাওয়ামন্ডলে ওজোনস্তর নামে অদৃশ্য এক বেষ্টনী বিদ্যমান। এ ওজোন স্তর পৃথিবীতে সূর্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মির প্রবেশ রোধ করে এবং বিকিরণ প্রক্রিয়ায় পৃথিবী থেকে আসা তাপ মহাশূণ্যে পুনরায় ফিরে যেতে সহায়তা করে। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দূষণের ফলে প্রকৃতির এ প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বেষ্টনি ওজোন স্তর প্রতিনিয়ত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। গৃহস্থালী পণ্য ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার, বিভিন্ন ধরনের স্প্রে ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয় ক্লোরোফ্লোরো কার্বন বা সিএফসি গ্যাস। শিল্প কারখানাতেও এ ক্ষতিকর গ্যাস ব্যবহৃত হয়। অবমুক্ত সিএফসি মহাশূন্যের ওজোন স্তর ক্ষয়কারী অন্যতম উপাদান।

তাছাড়া গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্য, কলকারখানা ও যানাহনের ধোঁয়া থেকে ক্রমবর্ধমান হারে নির্গত হচ্ছে কার্বন ডই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন প্রভৃতি গ্যাস। বায়ুমন্ডলে এসব গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে তাপ বিকিরণে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং সূর্য থেকে আগত কিছু তাপ পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ধরে রাখে। এভাবে একদিকে ওজোন স্তরের ক্ষয়জনিত কারণে মাত্রাতিরিক্ত সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছে, অন্যদিকে বায়ুমন্ডলে প্রতিনিয়ত তাপ সঞ্চিত হচ্ছে। ফলে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গ্রিন হাউজ ইফেক্ট-এর আর একটি অন্যতম প্রধান কারণ বনভূমি উজাড়করণ। বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার ফলে বৃক্ষ কর্তৃক কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের হারও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাও ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে যা গ্রিন হাউস ইফেক্টের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে।

গ্রিন হাউস ইফেক্ট প্রতিকারের উপায়
গ্রিন হাউস ইফেক্ট শুধু নয় বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক ভয়াবহ সংকট। এ বিপর্যয় রোধে আমাদের যেসব বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো-

১. বনায়ন কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বনায়ন বাড়াতে হবে। উপকূলবর্তী জেলাসমূহে অধিক হারে বৃক্ষরোপন করতে হবে। কারণ একমাত্র বৃক্ষই প্রকৃতি থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ করে।
২. বৃক্ষ নিধন রোধ করতে হবে। বৃক্ষ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে আনে এবং প্রকৃতিকে অক্সিজেন দিয়ে বিশুদ্ধ রাখে।
৩. যেসব গ্যাস বায়ুমন্ডলের উত্তাপ বাড়ায় তাদের নির্গমন রোধ করতে হবে।
৪. গ্যাসের চুলা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি অকারণে খেলা রাখা যাবে না। অপচয় রোধ করতে হবে।
৫. পরিবেশ বান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
৬. শিল্পকারখানায় জ্বালানির সাশ্রয় করতে হবে।
৭. পচা, ডোবা ও মজা পুকুরে মাছ চাষ করতে হবে। কারণ পচা জলেতে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়।
৮. চাষাবাদ পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে হবে।
৯. শিল্পবর্জ্য পুনরায় বিশুদ্ধকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
১০. দূষণ রোধে সরকার ও দেশের সব শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

গ্রিন হাউস ইফেক্ট একটি বৈশ্বিক সংকট। এ প্রতিক্রিয়ার অসহায় শিকার। ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-প্রাকৃতিক অবকাঠামো যতখানি এ সংকটের কুফলভোগী করেছে, সংকট সৃষ্টিতে আমাদের দেশের ভূমিকা তার চেয়ে নগণ্যই বটে। এ সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই কৌশলগতভাবে অগ্রসর হতে হবে, যাতে দীর্ঘকালীন প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করা যায়।