বিশেষ: প্রজনন ক্ষমতা কমে গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া কি পৃথিবীর হুমকি, কি বলছে বিশেষজ্ঞরা?

মানুষের গড় আয়ু এখন আগের চেয়ে বেশি। গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া একই সঙ্গে জন্মহার বেড়ে যাওয়া এই দুইটা বিষয় মিলেমিশে আমাদের পৃথিবীতে এক বৃহৎ পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
‘জনসংখ্যার রূপান্তর’ ধারণাটি প্রায় এক শতাব্দিরও পুরোনো। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এখন একই অবস্থা বিরাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষের সংখ্যা গত একশ বছরে চারগুণ বেড়েছে, ২ বিলিয়ন থেকে ৮ বিলিয়ন হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জন্মহার কমেছে, বেড়েছে মৃত্যুর হার। এর ফলে বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে প্রজনন হার (মহিলা প্রতি জন্ম) হ্রাস পেয়েছে।
চিকিৎসা বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ এর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় জানা গেছে, ‘বিশ্বব্যাপী প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ২০২১ সালে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি দেশে প্রজনন হার প্রতিস্থাপন স্তরের (রিপ্লেসমেন্ট লেভেল) এর নিচে ছিল।’ ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ফার্টিলিটি’ হলো জনসংখ্যার এমন এক স্তর, যেখানে একটি জনসংখ্যা এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে নিজেকে প্রতিস্থাপন করে।
সারা বিশ্বের জন্য ২০২১ সালে প্রজননের হার ছিল ২.৩ শতাংশ, প্রতিস্থাপন স্তরের (রিপ্লেসমেন্ট লেভেল) উপরে, যা ১৯৬০ সালের তুলনায় ৪.৭ শতাংশ কম। উচ্চ আয়ের দেশগুলির জন্য প্রজননের হার ছিল মাত্র ১.৬ শতাংশ, যা ১৯৬০ সালের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। সাধারণভাবে দরিদ্র দেশগুলিতে এখনও ধনীদের তুলনায় উচ্চ প্রজনন হার বিদ্যমান, কিন্তু তাদের এই হারও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
প্রজনন হারে ধস নামার ব্যাখ্যাটা আসলে কি?
এর উত্তরের একটি মজার বিষয় হলো- বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, প্রত্যাশিত সংখ্যার (বা কাঙ্ক্ষিত) চেয়ে অনেক বেশি শিশু এখন পৃথিবীতে বেঁচে থাকছে। অর্থাৎ শিশু মৃত্যুর হার খুব কম। তাই মানুষ জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো আগের তুলনায় বেশি অনুসরণ করে এবং তাদের মধ্যে সন্তান ধারণের আকাঙ্ক্ষাও কম।
সন্তান লালন-পালন এবং তাদের শিক্ষার ব্যয়ভারও এখন আগের চেয়ে বেশি। নারীরা এখন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ক্যারিয়ারের প্রতি বেশি মনোযোগী হচ্ছে, ফলে সন্তান জন্মদানের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
‘দ্য ইকোনোমিকস অব ফার্টিলিটি: এ নিউ এরা’ শিরোনামে ২০২২ সালে একটি চমৎকার জরিপ প্রকাশিত হয়েছিল। এই জরিপে মাধ্যমে লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, বর্তমান সময়ে নারীদের ক্যারিয়ার এবং সন্তান লালন-পালন একইসঙ্গে দুইটি কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। আর তা করতে গেলে অবশ্যই একজন সাহায্যকারীর প্রয়োজন হয়। সবার পক্ষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে সন্তান লালন-পালনের জন্য একজন কেয়ারগিভার রাখা সম্ভব হয় না, এই কারণেও সন্তান ধারণের আগ্রহ কমে যায়।
জনসংখ্যার এই রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এবং কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অতিমাত্রায় প্রজনন হার হ্রাস পৃথিবীকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এর একটি হলো একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কিভাবে পেনশন বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বজায় রাখা যায়, যেহেতু কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। তরুণ জনসংখ্যার ঘাটতি অনিবার্যভাবে অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করবে, যা দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।