SPORTS: দ্বিপাক্ষিক সিরিজের হিরো রশিদ খান বিশ্বকাপে বার বার কেন জিরো?

নাগিন ড্যান্স দেখে খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন রশিদ খান। ড্যান্সটা এতই মনে ধরেছে যে পারলে উইকেট শিকার করে তিনিও এমন একটা ড্যান্স দিয়ে মনটা হালকা করবেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠছে না।
হ্যাঁ, বিশ্বকাপের কথাই বলছি। যে রশিদ খানের ছোবলে ক্ষতবিক্ষত প্রতিপক্ষ। একাই গুগলি, ক্যারম বলে বদলে দেন ম্যাচের ভাগ্য, সেই রশিদ খান বিশ্বকাপে নামলেই জিরো। হয়ে যান খলনায়ক।
এখানে রশিদকে বাগে পেলেই ব্যাটসম্যান হয়ে যান সাপুড়ে। যেন বীণ বাজিয়ে উল্টো রশিদকেই নাচিয়ে ছাড়েন। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাও এই তালিকায়। শনিবার তো ধর্মশালায় বাংলাদেশের সঙ্গে উইকেটই পাননি তিনি।
উল্টো ৯ ওভার বোলিং করে ৪৮ রান দিয়েছেন রশিদ। শুধু এই ম্যাচই নয়, পরিসংখ্যান বলছে, দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হিরো হওয়া রশিদ বিশ্বকাপে আসলেই জিরো! আর তার এমন হওয়ার পেছনে অনেক কারণও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২০১৫ সালে রশিদের অভিষেক হয়েছিল। এরপর ওই বছরের ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলা হয়নি তার। পরের আসরে আফগান জার্সিতে ঝলক দেখানোর আভাস দিলেও শেষ পর্যন্ত নিভে যান দ্রুত।
সেবার ৯ ম্যাচে অংশ নেয়া রশিদ নেন ৬ উইকেট। সেটাই তার সম্বল। সবমিলিয়ে বিশ্বকাপে ৮০.৫ ওভার বোলিং করে নেন একটি মেডেন।
অথচ একদিনের ক্রিকেটে রশিদকে ছেড়ে খেলতে পারলেই যেন বাঁচেন প্রতিপক্ষ ব্যাটাররা। যেখানে ৯০ ইনিংসের ৩০টিতে মেডেন৷ আর বোলিং ইকোনমি কিংবা সেরা বোলিংয়েও তার দাপট সমান। কিন্তু বড় আসর এলেই ঝিমিয়ে যান তিনি।
কিন্তু কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ক্রিকেটবোদ্ধারা বলছেন, তার বোলিংয়ে বৈচিত্র্যের অভাব দেখা দিয়েছে। কেউ মনে করছেন, যে কয়টা ধরণ তার মূল অস্ত্র, সেগুলো ঠোটস্ত হয়ে গেছে অনেকের।
আর সেজন্য বেধড়ক মার খাচ্ছেন রশিদ খান। তবে এমনও হতে পারে বড় আসরের চাপ সামলে ঠিকঠাক বোলিং করা হচ্ছে না এই আফগান স্পিনারের। সেজন্য সিরিজে আলো ছড়ালেও বিশ্বকাপে রশিদ থাকেন আড়ালে।
রশিদ খান ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের নঙ্গরহারে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের পরই দেশটিতে যুদ্ধ বাঁধে। প্রাণ বাঁচাতে বহু লোক আশপাশের দেশে আশ্রয় নেয়। রশিদের বাবা মাও আফগানিস্তানে থাকতে পারেনি। চলে যান পাকিস্তানে।
সেখানে বেশ কিছু মাস থাকতে হয়। এরপর যুদ্ধ থামলে আবার আফগানিস্তানে ফিরে আসেন। এর মাঝে রশিদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও ক্রিকেট চলে। নিজের আইকন শহিদ আফ্রিদির মতো নিজেকে তৈরি করেন রশিদ।
এরপর দেশে ফিরলে আবার স্কুলে যাওয়া শুরু হয়। ক্রিকেটের পাশাপাশি চলে পড়াশোনাও। এভাবেই লড়াই করে এই সময়ের অন্যতম সেরা লেগ স্পিনার বনে গেলেন রশিদ।
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে রশিদ বেশ ভয়ংকর। তবে ওয়ানডেতেও কম যান না। ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তার ওয়ানডে অভিষেক হয়। এরপর থেকে ৯৫ ম্যাচ খেলে ১৭২ উইকেট শিকার করেছেন। সেরা বোলিং ১৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট।
অল্প দিনে বহু রেকর্ড নিজের দখলে নিয়েছেন এই ঘূর্ণি বোলার। ফ্রাঞ্চাইজি লিগগুলোতে তার বেশ কদর। ২০১৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই আইপিএলের নিলামে ৪ কোটি টাকা দিয়ে তাকে দলে নেয় সানরাইজার্স হায়দরাবাদ।
সহযোগী দেশের খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড গড়া রশিদকে পরের বছর আবার ৯ কোটি টাকা দিয়ে দলে টেনে নেয় হায়দরাবাদ। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে আইসিসির ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠেন তিনি।
সে মাসেই টি-২০তেও শীর্ষ বোলার হন আফগানিস্তানের এই লেগ স্পিনার। লাইন লেংথ ধরে রেখে দ্রুত গতির লেগ স্পিনের সঙ্গে গুগলির বুদ্ধিদীপ্ত মিশ্রণে বিশ্বসেরা বোলার হয়ে উঠেছেন রশিদ।
২০১৫ সালে অভিষিক্ত রশিদ ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নিয়মিত রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলায় নেমেছেন। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রথমবারের মতো আফগানিস্তানের অধিনায়কত্ব করেন এই লেগ স্পিনার।
মাত্র ১৯ বছর ১৬৫ দিন বয়সে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে আন্তর্জাতিক অধিনায়ক হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। একই বাছাইপর্বে শাই হোপকে আউট করে ওয়ানডেতে সর্বকনিষ্ঠ ও দ্রুততম বোলার হিসেবে ১০০ উইকেট পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন।
মাত্র ৪৪ ম্যাচেই এ মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন রশিদ। বোলিংয়ে এতসব অর্জনেও রশিদের অন্য সত্ত্ব ঢাকা পড়ে না। এই আফগান শুধু বল হাতেই নন, ব্যাটিং ও ফিল্ডিংয়েও দলের অন্যতম ভরসা তিনি।
সাধারণত কভারের মতো মহা গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতেই দাঁড়ান রশিদ। দারুণ অ্যাথলেটিক বলে প্রায়শ দুর্দান্ত সব ক্যাচও ধরেন। ব্যাটিংয়েও ইনিংসের শেষ দিকে এসে ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখেন এ ক্রিকেটার।