বিশেষ: ২০ কেজির ‘ফুটবল’ নিয়ে ঘুরে বেড়ান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, জেনেনিন কেন?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ায়ে যে থাকে, তখন তার সঙ্গে থাকে একটি কালো রঙের ব্রিফকেম। তার নাম ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’। নাম ফুটবল হলেও খেলার মাঠের ফুটবলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। প্রেসিডেন্টের সহকারীর হাতে সবসময় থাকে কালো রঙের একটি ব্রিফকেস। আকারে খুব বড় নয় কিন্তু এরওজন প্রায় ২০ কেজি। কালোর উপর সোনালি রঙের তালাটিও চোখে পড়ে। বাইডেন বা ট্রাম্পের মতো নির্দিষ্ট কেউ নন, যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই এই ২০ কেজির কালো ব্রিফকেস রাখেন।

ব্রিফকেসটি বহন করার দায়িত্বে থাকেন একজন সামরিক কর্মী। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই বিশেষ ‘ফুটবলের’ অনেক তাৎপর্য রয়েছে। এই ব্রিফকেসের যার মধ্যে লুকনো আছে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু হানার মন্ত্র। সেই মন্ত্রই সঙ্গে রাখেন প্রেসিডেন্ট।

কী কী আছে এই ব্রিফকেসের ভিতরে?

এই ব্রিফকেসের ভিতর আাছে মাত্র চারটি উপাদান। দুটি বই, একটি ফাইল এবং একটি কার্ড। তা দিয়েই যে কোনও মুহূর্তে পরমাণু আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

নিউক্লিয়ার ফুটবলের প্রথম উপাদানের নাম ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’। এই বইয়ের দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি, প্রস্থ ৯ ইঞ্চি। এতে রয়েছে কালো এবং লাল রঙে ছাপা ৭৫টি খোলা পাতা। শত্রুকে কীভাবে আক্রমণ করা যায়, তারই কিছু বিকল্প এই বইতে রয়েছে।

ব্রিফকেসের দ্বিতীয় উপাদান আরও একটি বই। এর আকারও ‘ব্ল্যাক বুক’এর মতোই। এই বইতে তালিকার আকারে রয়েছে নিরাপদ কিছু ঠিকানা, জরুরি পরিস্থিতিতে যেখানে প্রেসিডেন্ট আশ্রয় নিতে পারেন। এই বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি সম্পূর্ণ কালো রঙে ছাপা।

নিউক্লিয়ার ফুটবলে রয়েছে একটি ফাইল, যার নাম ‘ম্যানিলা ফোল্ডার’। এতে আট থেকে দশটি খোলা পাতা পিন করা রয়েছে। এমার্জেন্সি অ্যালার্ট সিস্টেম ব্যবহারের বর্ণনা রয়েছে এই ফাইলে।এ ছাড়াও প্রেসিডেন্টের ব্রিফকেসে একটি ছোট কার্ড থাকে। তার দৈর্ঘ্য ৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ইঞ্চি। এই কার্ডে বিভিন্ন অথেন্টিকেশন কোড লেখা থাকে।

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যদি পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে একমাত্র তার নির্দেশে এই ব্রিফকেস খোলা হবে। সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবাণী পৌঁছে যাবে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধানের কাছে।

মন্ত্রণালয়ের অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনা করে আক্রমণের কী কী সুযোগ আছে, তা খতিয়ে দেখবেন প্রেসিডেন্ট। তার পরেই দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন প্রেসিডেন্ট। অটুট নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে আগে বাড়বে পুরো প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পরমাণু আক্রমণের নির্দেশ পাওয়ার পর নির্দেশদাতা সত্যিই প্রেসিডেন্ট কি না, তা যাচাই করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে।

‘বিস্কুট’ নামের একটি প্লাস্টিকের কার্ডে লেখা বিশেষ কিছু কোড রয়েছে। সেই সংকেতের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের পরিচয় যাচাই করবেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। নির্দেশদানকারীর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হলে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ করা ছাড়া প্রতিরক্ষাপ্রধানের সামনে আর কোনও উপায় থাকে না।

পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ করার প্রতি ধাপে নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক স্তর পেরিয়ে আসতে হয়। বার বার যাচাই না করে কোন পদক্ষেপ নেয়া যায় না। একমাত্র প্রেসিডেন্টই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। আর কারও সেই ক্ষমতা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের হাতেই পরমাণু আক্রমণের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে আইনে এ-ও বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট কোন বেআইনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। যদি তার সিদ্ধান্ত বেআইনি হয়, সেনারা তা অমান্য করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি শাখা থেকে এক জন করে পালা অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফুটবল বহন করে থাকেন। এই বহনকারী বার বার পরিবর্তিত হয়। কে কখন এই দায়িত্ব পাবেন, কেউ আগে থেকে টের পান না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিউক্লিয়ার ফুটবলের সংখ্যা অবশ্য একটি নয়। একই ধরনের তিনটি ব্রিফকেস রয়েছে। একটি প্রেসিডেন্ট এবং একটি ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছে থাকে। যদিও এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্টই।

কোনো কারণে প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে সেই ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে। এ ছাড়া, তৃতীয় ফুটবলটি রাখা থাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক দপ্তর হোয়াইট হাউসে।

ফুটবলের মধ্যের কার্ডটিতে যে সংকেতে লেখা থাকে, একমাত্র প্রেসিডেন্টই তা ব্যবহার করতে পারেন। নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট বদল হলে নিজে থেকেই সংকেতগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য আবার তা সক্রিয় করা হয়। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করার মতো পরিস্থিতি সাধারণত আসে না।

সহজে পরমাণু আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেবেন না আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তারপরেও সবসময় তার সঙ্গে থাকবে কালো ব্রিফকেস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার স্বার্থেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সর্বত্র ঘুরে বেড়াবে নিউক্লিয়ার ফুটবল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *