ভাতার দিন শেষ, এবার চাই পাকা চাকরি!’ খাস বাংলায় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধের জল্পনা উসকে মুখ্যমন্ত্রীর বিস্ফোরক বার্তা

কোভিডকালের ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর আদলে এবার পশ্চিমবঙ্গকে একটি স্বনির্ভর ও উৎপাদনমুখী রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে জোর সওয়াল করতে দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যকে। সম্প্রতি দুর্গাপুরের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, দীর্ঘ ১৫ বছরের জমানায় চলা ভাতা-নির্ভর সংস্কৃতি থেকে বাংলাকে সম্পূর্ণ বের করে এনে কর্মসংস্থানমুখী ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু রাজ্য সরকারের এই নীতি বদলের ঘোষণা সামনে আসতেই সাধারণ উপভোক্তাদের মনে দানা বেঁধেছে তীব্র আশঙ্কা। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অন্নপূর্ণা যোজনার মতো জনপ্রিয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি?
ভাতার বদলে ‘ভাতের’ প্রত্যাশা: সরকারের নতুন বার্তা
সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রবণতা বজায় রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোট বৈতরণী পার হতে মহিলাদের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা বিভিন্ন ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তা সফলও হয়েছে। বর্তমান বিজেপি সরকারও ক্ষমতায় আসার পর অন্নপূর্ণা যোজনার মাধ্যমে যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে এবং যুবশক্তি প্রকল্পের মতো কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ভাতা-রাজনীতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুর্গাপুরের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া সুরে বলেন, “মোদিজি যখন আত্মনির্ভর ভারতের ডাক দিতেন, তখন বিগত সরকারের আমলে ভাতা-নির্ভর বাংলা তৈরি করা হয়েছিল। আমাদের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
একই সুর শোনা গেছে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের গলাতেও। বীরভূমের একটি জমায়েতে তিনি বলেন, “যত বেশি ভাতার বদলে ভাতের প্রত্যাশা আপনারা বাড়াতে পারবেন, তত সমাজের মঙ্গল। মুখ্যমন্ত্রী এমন এক দিনের স্বপ্ন দেখেন, যেদিন এই রাজ্যের মায়েরা এসে বলবেন—শুভেন্দুবাবু, আমাদের ভাতা ফিরিয়ে নিন, কারণ আমাদের ছেলে-মেয়েরা আজ পাকা চাকরি পেয়েছে।”
উপভোক্তাদের মনে দানা বাঁধছে তীব্র আশঙ্কা
সরকারি এই নতুন নীতির কথা সামনে আসতেই সমাজের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের অন্দরে শুরু হয়েছে চরম উদ্বেগ। দুর্গাপুরের নীলডাঙার বাসিন্দা পরিচারিকা পূর্ণিমা অঙ্কুর আক্ষেপের সুরে জানান, “আগে পেতাম পনেরোশো টাকা, এখন তিন হাজার টাকা হয়। এই টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার কিনি, ছেলেমেয়ের শখ মেটাই। হঠাৎ করে এই সাহায্য বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের মতো গরিব মহিলারা কীভাবে সংসার চালাবেন?”
বিশিষ্ট সাহিত্যিক রঞ্জিত গুহর মতে, “হঠাৎ করে বার্ধক্য বা বিধবা ভাতার মতো প্রকল্প বন্ধ করে দিলে বিরাট সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। বিকল্প জীবিকা ও কর্মসংস্থান সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত না করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।” বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলিও এই সুযোগে আসরে নেমে পড়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন কাউন্সিলর পল্লব নাগ ও সিপিআইএম নেতা সীমান্ত চট্টোপাধ্যায় উভয়েই সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে জানিয়েছেন যে, রাজস্ব ব্যয় বা পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন থাকলেও প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার এই শেষ সম্বলটুকু হঠাৎ কেড়ে নেওয়া অনুচিত।
বিজেপির সাফাই: স্বনির্ভরতা ও কর্মসংস্থানেই জোর
তীব্র সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, সরকার কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হঠাৎ বন্ধ করে দিচ্ছে না। দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী বা সরকার কাউকে বিপদে ফেলতে চাইছে না। বরং রাজ্যবাসীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাপক শিল্পায়ন, এবং গ্রামীণ এলাকায় ১২৫ দিনের কাজ সহ স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য, যাতে সাধারণ মানুষ আজীবন ভাতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে না থাকে।” সব মিলিয়ে, ভাতা বনাম কর্মসংস্থানের এই দ্বন্দ্বে এখন উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গন।