সোশাল মিডিয়ায় রিল বানানোর অন্ধ নেশা! কিশোরের চোখ বেঁধে গায়ে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার ভিডিও ভাইরাল, গ্রেপ্তার ৪

সোশাল মিডিয়ায় সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন এবং রিল (Reel) তৈরির নেশা মানুষকে কতটা অন্ধ ও পৈশাচিক করে তুলতে পারে, তার এক মর্মান্তিক ও হাড়হিম করা ঘটনার সাক্ষী থাকল খাস কলকাতা। রিল বানানোর লোভে এক কিশোরকে ফাঁদে ফেলে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার উপর বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন চালানোর এবং সর্বশেষ গায়ে পেট্রল ঢেলে তাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার অভিযোগ উঠল একদল যুবকের বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কলকাতার গড়েরিয়া (গড়ফা) এলাকার নেলিনগরে।
এই ভয়ংকর ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পরই পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এই নৃশংস ঘটনায় মূল অভিযুক্ত অর্ঘ্য সহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে গড়েরিয়া থানার পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে কয়েকজন নাবালকও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল গড়েরিয়ার নেলিনগরে?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নির্যাতিত ওই কিশোর এবং অভিযুক্তরা সকলেই একই এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার দিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই কিশোরকে খেলার নাম করে ডেকে নিয়ে যায় এলাকারই কয়েকজন যুবক ও কিশোর। এরপরই শুরু হয় অমানবিক অত্যাচার।
অভিযোগ, প্রথমে ওই কিশোরের মাথায় একটি হেলমেট পরিয়ে তার চোখ শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তার মাথায় উপর্যুপরি কিল, চড় ও ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করতে থাকে অভিযুক্তরা। এই নির্মম নির্যাতনে যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে কিশোরটি যখন মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেলে, তখন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে অভিযুক্তরা।
চরম হিংস্রতা: পেট্রল ঢেলে আগুন ও ভিডিও শুট
তদন্তে নেমে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, এরপর ‘শাস্তি’ দেওয়ার নামে চরম হিংস্র পথ বেছে নেয় ওই যুবকরা। একটি স্কুটারের সিটের নিচ থেকে বোতলে রাখা পেট্রল বের করে সরাসরি কিশোরের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মূল অভিযুক্তের হাতে দেশলাই দিয়ে কিশোরের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়!
পেট্রল থাকায় নিমেষে কিশোরের জামায় আগুন ধরে যায়। প্রাণভয়ে সে দৌড়াতে শুরু করে এবং হাত দিয়ে জামার আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। অথচ, এই দৃশ্য দেখেও অভিযুক্তরা বিন্দুমাত্র সংবেদনশীল না হয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে এবং হাসতে থাকে। শুধু তাই নয়, গোটা পৈশাচিক কান্ডটি মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করা হয় এবং পরে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় রিল হিসাবে আপলোডও করা হয়!
পুলিশের জালে ৪ অভিযুক্ত
ঘটনার পর চরম আতঙ্কিত ও মানসিক ভেঙে পড়া নির্যাতিত কিশোর বাড়ি ফিরে পরিবারকে সবটা খুলে বলে। পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত গড়েরিয়া থানায় গিয়ে সমস্ত ঘটনার কথা জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এদিকে, ইন্টারনেটেও এই নৃশংস ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়, যা তদন্তকারী অফিসারদের নজরে আসে। পরিবারের অভিযোগ এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সূত্র ধরে দ্রুত অভিযান চালায় পুলিশ। মূল অভিযুক্ত অর্ঘ্য সহ মোট চারজনকে পাকড়াও করা হয়েছে। যেহেতু ধৃতদের মধ্যে একাধিক জন নাবালক, তাই জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের (Juvenile Justice Board) নিয়ম মেনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তবে ঠিক কী কারণে এই বর্বরোচিত কাণ্ড ঘটানো হলো, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। এটি নিছকই রিল তৈরির অন্ধ নেশা এবং সস্তা জনপ্রিয়তার উন্মাদনা, নাকি এর নেপথ্যে পুরনো কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অন্য কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। খাস কলকাতার বুকে এমন রোমহর্ষক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।