একটি ছোট্ট চেন টানলেই কীভাবে থেমে যায় হাজার হাজার টনের ট্রেন? জানলে অবাক হবেন এই রুদ্ধশ্বাস বিজ্ঞান!

দেশের এমন মানুষ খুব কমই রয়েছেন, যিনি জীবনে অন্তত একবার ট্রেনে চড়েননি। দীর্ঘ দূরত্বের সফর হোক বা নিত্যদিনের যাতায়াত— ট্রেনই আমাদের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো যাত্রী তাড়াহুড়োয় প্ল্যাটফর্মে কিছু কিনতে নামলেন, কিন্তু তার মধ্যেই ট্রেন চলতে শুরু করল। তখন ওই যাত্রীকে বা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে কেউ একজন টেনে দেন লাল রঙের অ্যালার্ম চেন বা শিকল। আর সেই চেন টানার সঙ্গে সঙ্গেই সশব্দে থেমে যায় ছুটে চলা ট্রেনটি।

কিন্তু কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, হাজার হাজার টন ওজনের এবং এত দ্রুত গতিতে ছুটে চলা একটি বিশাল ট্রেন কীভাবে কেবল একটি ছোট্ট চেন টানার সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায়? এর নেপথ্যে কাজ করে রেলের অত্যন্ত নিখুঁত ও বিশেষ এক প্রযুক্তি— যাকে বলা হয় ‘এয়ার ব্রেক’ (Air Brake) প্রযুক্তি।

কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ব্রেক লাগে?
সাধারণত আমাদের ধারণা, কোনো গাড়ি বা বাইক থামাতে হলে ব্রেকের ওপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু ভারতীয় রেলের আধুনিক এয়ার ব্রেক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অন্য এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করে।

ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে একদম শেষ কামরা পর্যন্ত একটি মোটা পাইপলাইন যুক্ত থাকে, যাকে বলা হয় ‘ব্রেক পাইপ’ (Brake Pipe)। ট্রেন যখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে, তখন এই পাইপের ভেতরে নির্দিষ্ট ও উচ্চ মাত্রায় বাতাসের চাপ বজায় রাখা হয়। বাতাসের এই প্রচণ্ড চাপের সাহায্যেই ব্রেক সিলিন্ডারের পিস্টন ব্রেক শু-কে চাকা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এর ফলে চাকা কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে ঘুরতে পারে এবং ট্রেন ছুটতে থাকে।

এবার কোনো যাত্রী যখন অ্যালার্ম চেন টানেন, তখন সংশ্লিষ্ট কামরার ঠিক নিচে থাকা একটি বিশেষ ভালভ খুলে যায়। এর ফলে ব্রেক পাইপের ভেতরে থাকা উচ্চচাপের বাতাস দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। পাইপের ভেতরে বাতাসের চাপ হঠাত্ কমে যাওয়ার কারণে ব্রেক সিলিন্ডার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক শু চাকার সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে চেপে বসে। ফলে ট্রেনের গতি মুহূর্তের মধ্যে কমতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত ট্রেনটি সম্পূর্ণ থেমে যায়।

লোকো পাইলট কীভাবে বুঝতে পারেন চেন টানা হয়েছে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, চেন টানলে কি কেবল সেই নির্দিষ্ট কামরাতেই ব্রেক কষে? বাস্তবে তা কিন্তু নয়। ট্রেনের প্রতিটি কামরার ব্রেক পাইপ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে।

ফলে কোনো একটি কামরায় ভালভ খুলে বাতাস বেরিয়ে গেলেই গোটা ব্রেক পাইপের প্রেশার বা চাপ কমে যায় এবং ট্রেনের প্রতিটি কামরায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক সক্রিয় হয়ে পড়ে। কেবিনে থাকা লোকো পাইলট ব্রেক পাইপের ‘প্রেশার গেজ’-এ চাপ কমে যাওয়ার বিষয়টি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে ইঞ্জিনে সতর্কতামূলক অ্যালার্ম বা ইন্ডিকেটরও বেজে ওঠে। এরপর পাইলট নিজের দক্ষতায় ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ দূরত্বে গাড়ি থামানোর ব্যবস্থা করেন।

আধুনিক এলএইচবি (LHB) কোচেও অত্যন্ত উন্নত মানের এয়ার ব্রেক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ট্রেনের গতি, ওজন, লাইনের ঢাল, ব্রেকের বর্তমান অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ট্রেন সম্পূর্ণ থামতে কতটা দূরত্ব নেবে। তাই চেন টানলেই যে ট্রেন এক লহমায় থেমে যাবে, এমন কোনো নির্দিষ্ট বা নির্দিষ্ট মাপের নিয়ম নেই।

কোন কামরায় চেন টানা হয়েছে, তা কীভাবে বোঝা যায়?
চলন্ত ট্রেন হঠাত্ থেমে যাওয়ার পর রেলকর্মীদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ২০ থেকে ২৪টি কামরার মধ্যে ঠিক কোন কামরায় চেন টানা হয়েছে তা খুঁজে বের করা। একে একে সব কামরা পরীক্ষা করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

এই সমস্যার সমাধান করতে কোচে বিশেষ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা থাকে। যে কামরায় অ্যালার্ম চেন টানা হয়, সেখানে থাকা বিশেষ ইন্ডিকেটর বা ইমার্জেন্সি ফ্ল্যাশার লাইটের সাহায্যে সংশ্লিষ্ট কামরাটি দূর থেকেই শনাক্ত করা যায়। এছাড়া পুরনো কিছু কোচে বাইরের দিকে থাকা লাল রঙের একটি লিভার বা ইন্ডিকেটরের অবস্থান বদলে যেত, যা দেখে রেলকর্মীরা সহজে বুঝতে পারতেন কোথায় চেন টানা হয়েছে।

এরপর রেলকর্মীরা সংশ্লিষ্ট ভালভ পরীক্ষা করে তা রিসেট করেন। ব্রেক পাইপে পুনরায় প্রয়োজনীয় হাওয়া বা চাপ তৈরি হওয়ার পরই ট্রেনটি পুনরায় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *