শব্দ নেই বলে নিশ্চিন্তে বাচ্চার হাতে ‘সাপ বাজি’ দিচ্ছেন? সিআরএফ-এর রিপোর্টে জানা গেল চরম প্রাণঘাতী তথ্য!

কালীপুজো বা দেওয়ালির সন্ধ্যায় একটা ছোট্ট কালচে বড়িতে দেশলাইয়ের আগুন দিলেই তা ‘ফুঁস’ করে কালো ধোঁয়া ছেড়ে অজগরের মতো লম্বা সাপের আকার নেয়। আর সেই রূপ দেখে বাড়ির খুদে সদস্যদের আনন্দের যেন কোনো সীমা থাকে না। এই বাজিতে কোনো বিকট শব্দ নেই, নেই আগুনের ফুলকি ছিটকে আসার তীব্র ভয়ও। তাই অনেক অভিভাবকই খুব নিশ্চিন্তে সন্তানদের হাতে তুলে দেন নির্দোষ দেখতে এই বাজিটি।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, উৎসবের এই আপাত নিরীহ আনন্দ আসলে আপনার সন্তানের ফুসফুস ও স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর এক প্রাণঘাতী ফাঁদ তৈরি করছে?

শব্দবাজির চেয়েও হাজার গুণ ক্ষতিকর! সিআরএফ-এর বিস্ফোরক তথ্য
বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও, এই সাপ বাজিটি মূলত অত্যন্ত মারাত্মক দাহ্য রাসায়নিকের মিশ্রণে তৈরি। এটি জ্বললে সাধারণ উচ্চমাত্রার শব্দবাজির চেয়েও বহুগুণ বেশি বিষাক্ত বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে।

পুনের বিখ্যাত ‘চেস্ট রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (CRF)-এর বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, শব্দহীন এই সাপ বাজি আসলে বাতাসের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করে। গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৩ মিনিট ধীরে ধীরে পোড়ানোর সময় এই বাজিটি থেকে সর্বোচ্চ ৬৪ হাজার মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার পিএম ২.৫ (PM 2.5) বিষাক্ত ধূলিকণা নির্গত হয়!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এই মাত্রা স্বাভাবিক ও নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (CPCB)-র রিপোর্ট বলছে, অন্যান্য আলোর বা শব্দবাজির তুলনায় দীর্ঘক্ষণ ধোঁয়া তৈরি করা বাজিগুলিতে দূষণের স্থায়ী ঘনত্ব বহুগুণ বেশি থাকে।

শিশুদের ফুসফুসে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড ও স্থায়ী ক্ষতি
যাঁরা হাঁপানি, অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য এই বাজির কালচে বিষাক্ত ধোঁয়া সরাসরি স্লো-পয়জনের মতো কাজ করে। এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষও এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে তাৎক্ষণিক ঘন ঘন কাশি এবং শ্বাস নেওয়ার কষ্টে ভুগতে শুরু করেন।

শিশু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বাজি পোড়ানোর সময় বাচ্চার কৌতূহলবশত একদম কাছে গিয়ে ঝুকে বসে থাকে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। শিশুদের ফুসফুসের গঠন বড়দের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। এই বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত ধোঁয়া তাঁদের শ্বাসনালীর স্থায়ী ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। অতীতে এই ধরনের সাপের ধোঁয়ার কারণে অনেক শিশুকে তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালেও ভর্তি করাতে হয়েছে।

ছাই থেকেও ছড়ায় বিষক্রিয়া!
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল ধোঁয়া নয়— বাজিটি পুরোপুরি পুড়ে যাওয়ার পর মাটিতে যে ছাই অবশিষ্ট থাকে, তাও মারাত্মক ক্ষতিকারক রাসায়নিকে ভরা। মাটিতে পড়ে থাকা এই বিষাক্ত ছাই ভুলবশত ছোঁয়াচ লেগে বা হাত না ধুয়ে বাচ্চাদের মুখে চলে গেলে তীব্র পেটের সংক্রমণ কিংবা বিষক্রিয়া হতে পারে। তাই বাজি পোড়ানোর পর সেই স্থানটি সাবধানে দ্রুত জল দিয়ে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি।

ব্যালকনি বা আবদ্ধ স্থানে পোড়ানোর মারাত্মক ভুল!
শব্দ হয় না বলে অনেকেই ফ্ল্যাটের বন্ধ ব্যালকনি, ছাদ বা ঘরের বারান্দায় এই বাজি পোড়ানোর বড়সড় ভুলটি করে বসেন। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বদ্ধ বা কম হাওয়াবাতাস থাকা জায়গায় এই বাজির বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ঘনীভূত হয়ে বাতাসে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি তৈরি করে।

অক্সিজেনের অভাবেই সাময়িকভাবে ঘরে থাকা লোকজনের হঠাৎ মাথা ঘোরা থেকে শুরু করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো বিপজ্জনক দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সমীক্ষা বলছে, কালীপুজোর রাতে বাতাসের গুণগত মান সবচেয়ে বেশি খারাপ হওয়ার অন্যতম প্রচ্ছন্ন কারণ হলো এই ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকা সাপ বাজি।

কী করবেন?
উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই নিজের পরিবার বা প্রিয়জনের শারীরিক ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শিশুদের এই বিষাক্ত রাসায়নিক বাজির বদলে পরিবেশবান্ধব সবুজ বাজি, মাটির প্রদীপ বা নানা রঙের আলপনা ও আলো জ্বালানোর প্রথাগত আনন্দে উৎসাহিত করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *