মার্কিন মিডটার্ম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের জয়! এক ধাক্কায় ৩ লক্ষ কোটি ডলার উধাও, বিশ্ববাজারে ভয়ঙ্কর ধস!

আমেরিকার সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল এবং রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে নতুন করে গভীর উদ্বেগ ও চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক সমীকরণের এই পরিবর্তনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) শিল্পখাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে—এমন তীব্র আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে গেছে। যার সরাসরি প্রভাবে বৃহস্পতিবারের লেনদেনের শেষে মার্কিন শেয়ার বাজারে এক ঐতিহাসিক ও বড়সড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। এক ধাক্কায় বিশ্ব বাজার থেকে মুছে গিয়েছে ৩ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশি বিশাল পরিমাণ বাজারমূল্য। আমেরিকার এই আর্থিক মন্দার মারাত্মক প্রভাব তৎক্ষণাৎ আছড়ে পড়েছে এশিয়ার বিভিন্ন প্রধান বাজারগুলিতেও।
বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে আমেরিকার প্রধান তিনটি স্টক সূচকেই নজিরবিহীন পতন দেখা যায়। হেভিওয়েট সূচক ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ এক ঝটকায় ১,৮০০ পয়েন্টেরও বেশি নিচে নেমে আসে। অন্যদিকে, প্রযুক্তি নির্ভর সূচক নাসডাকের পতন ১,৪০০ পয়েন্টের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৩০০ পয়েন্টেরও বেশি কমে যায়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে বাজারে যে চাঙ্গা ভাব বা উত্থান লক্ষ্য করা গিয়েছিল, সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ ধসের ফলে তার সিংহভাগ লাভই সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের মূল আশঙ্কার কারণ হলো, আমেরিকায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পালাবদলের ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক সংস্থাগুলির উপর বিধিনিষেধ ও সরকারি নজরদারি আরও কঠোর হতে পারে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রক্রিয়া, বিপুল বিদ্যুতের ব্যবহার, প্রযুক্তি জায়ান্টগুলির মধ্যে বাজার প্রতিযোগিতা এবং কম্পিউটিং পরিকাঠামোর মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন ও কড়া আইন আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এই আশঙ্কার বশবর্তী হয়েই বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর চিপ নির্মাতা সংস্থাগুলির শেয়ার থেকে দ্রুত নিজেদের বিনিয়োগ তুলে নিতে শুরু করেছেন।
আমেরিকার এই পতনের রেশ আছড়ে পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হতেই মারাত্মক ধস নামে। বেঞ্চমার্ক কোস্পি সূচক এক ধাক্কায় ৮.৫ শতাংশ পড়ে ৫,০০০ পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। নজিরবিহীন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে ২০ মিনিটের জন্য পুরো লেনদেন বন্ধ রাখতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান চিপ নির্মাতা সংস্থাগুলির শেয়ারেও ব্যাপক বিক্রির প্রচণ্ড চাপ দেখা যায়।
সি-ডেপের (C-DEP) প্রেসিডেন্ট জয়জিৎ ভট্টাচার্য ‘টাইমস নাও ডিজিটাল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানান যে, বিশ্বজুড়ে এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি হওয়া তীব্র উদ্বেগই এই বাজারের পতনের প্রধান অনুঘটক। তাঁর মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জোরালো প্রভাব ও জয়ের ফলে মার্কিন কংগ্রেসের তরফে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বড় সংস্থাগুলির উপর নজরদারি বহুগুণ বাড়তে পারে। এআই পরিচালনা, ডেটা সেন্টারের আকাশছোঁয়া বিদ্যুৎ খরচ এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার নিয়ম আরও কঠিন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বিশদে জানান যে, বিশ্বজুড়ে এআই শিল্পে যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল দ্রুত বাণিজ্যিক সাফল্য এবং ভবিষ্যতে আকাশছোঁয়া মুনাফার প্রত্যাশা। কিন্তু যদি নতুন সরকারি নিয়মকানুন, অতিরিক্ত খরচ কিংবা পরিকাঠামো সম্প্রসারণে নতুন কোনো আইনি বাধা তৈরি হয়, তবে কর্পোরেট সংস্থাগুলির আর্থিক মূল্যায়ন নতুন করে পর্যালোচনা করতে বাধ্য হবেন বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে এআই সংস্থাগুলির শেয়ারের অতিরিক্ত মূল্যায়ন এবং যে পরিমাণ মূলধনী বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার অনুপাতে আদৌ কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মনে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এই বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও ভারতের অর্থনীতির জন্য এটিকে ঝুঁকির পাশাপাশি একটি দারুণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞ জয়জিৎ ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, আমেরিকার প্রযুক্তি শেয়ারে যদি দীর্ঘস্থায়ী পতন অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের প্রবাহ এবং সামগ্রিক বাজারের মনোভাব মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যদি নিয়ন্ত্রণ ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে, তবে গ্লোবাল প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এআই পরিকাঠামো স্থাপন ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য বিকল্প নিরাপদ দেশ খুঁজতে বাধ্য হবে। সেই বহুমুখী সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে ভারতের নিজস্ব কম্পিউটিং ক্ষমতা, মজবুত ডেটা সেন্টার পরিকাঠামো এবং এআই গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রকে এখনই আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।