মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর শর্ত দিল তেহরান! আমেরিকার কাছে ৭ দফা দাবি পেশ করে কী বার্তা দিল ইরান?

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও উত্তেজনার ঘনঘটার মাঝেই নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, পারমাণবিক কর্মসূচি ও সংকট সমাধানের লক্ষ্যে আমেরিকার কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। তবে আলোচনার টেবিলে বসার আগে এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে সাতটি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন কূটনৈতিক চালে আন্তর্জাতিক মহলে ফের একবার চরম উদ্বেগের আবহ তৈরি হয়েছে।

ইরানের পক্ষ থেকে পেশ করা এই সাতটি দফার মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু কঠোর ও সুদূরপ্রসারী দাবি। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিক মোহসেন রেজাইয়ের সূত্রে জানা গিয়েছে, এই শর্তগুলি পূরণ না হলে তেহরান কোনওভাবেই আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালীও উন্মুক্ত করা হবে না। ইরান দাবি করেছে যে তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত ধরনের সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, যার মধ্যে লেবাননে চলমান সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের বন্দরগুলির ওপর থেকে আমেরিকার একতরফা নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নিতে হবে এবং দেশটির ওপর জারি থাকা সমস্ত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

এছাড়াও তেহরানের দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সমস্ত বাজেয়াপ্ত সম্পদ ও অর্থ অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণকৌশলগত এলাকায় আমেরিকার মাত্রাতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি ও সেনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। বিগত দিনে যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ওয়াশিংটনকে। পরিশেষে, ভবিষ্যতে ইরানের সার্বভৌম ভূখণ্ডে আমেরিকার সমস্ত ধরনের সামরিক হামলা চিরতরে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে, কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশের হাত ধরে আমেরিকার কাছে এই পরমাণু প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে হোয়াইট হাউস এবং ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এই প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন। যদিও তেহরান ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহলের বাইরে এই প্রস্তাবের বিস্তারিত বিষয়বস্তু এখনও পুরোপুরি প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবুও এর ফল যে সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

অন্যদিকে, ইরানের এই কঠোর শর্তের বিপরীতে আমেরিকার অবস্থানও বেশ অনমনীয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেননি। হোয়াইট হাউসের স্পষ্ট দাবি, যে কোনও প্রাথমিক বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচিকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এদিকে তেহরানও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যে নতুন করে হামলা শুরু হলে আরও ভয়াবহ ও বৃহৎ আকারে পাল্টা আঘাত হানবে তারা।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী। ইরান এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও আলোচনা প্রক্রিয়াকে নিজেদের সাত দফা শর্ত পূরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। ফলে মার্কিন প্রশাসন এবং ইরানের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে আদৌ কোনও কার্যকর সমঝোতা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মকভাবে পড়বে, সে বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত অর্থনীতিবিদরা। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল সংঘাতে শান্তি ফেরানোর যে সামান্য কূটনৈতিক সদিচ্ছা দেখা গিয়েছিল, তা এখন এই সাত দফা শর্তের বেড়াজালে পড়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *